পোশাক রপ্তানিতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি ডলার আয় হয়। কিন্তু সেই আয়ের কতটুকু সত্যিই দেশে থেকে যায়, সেটাই মূল প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ‘মূল্য সংযোজন’ (ভ্যালু অ্যাডিশন)। সহজ ভাষায় বললে, রপ্তানি আয় থেকে কাঁচামাল আমদানিতে যা খরচ হয়, তা বাদ দিয়ে বাকি অংশটুকুই হলো মূল্য সংযোজন। এই অংশের ভেতর থেকেই মজুরি, জ্বালানি খরচ, পরিবহন ও উদ্যোক্তার মুনাফা মেটানো হয়। আর এই হার বাড়ার মানে হলো, দেশের অর্থনীতিতে বেশি টাকা থাকছে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, পোশাক খাতে সেই মূল্য সংযোজনের হার বাড়ছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০.০১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কাঁচামাল আমদানিতে খরচ হয়েছে ৩.৮৭ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের ৩৮.৩২ শতাংশ। বাদবাকি ৬১.৬৮ শতাংশই মূল্য সংযোজন। গত বছর একই সময়ে এই হার ছিল ৫৬.৭৮ শতাংশ।
শুধু এই প্রান্তিক নয়, পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চিত্রও আশাব্যঞ্জক। ওই অর্থবছরে পোশাক খাতের নিট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৪.২২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ২৩.২২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪.৩১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় কমেছে ৮.৫৪ শতাংশ। ফলে পুরো অর্থবছরে গড় মূল্য সংযোজনের হার দাঁড়িয়েছে ৬২.১৫ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের ৫৯.০১ শতাংশ থেকে ৩.১৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ২০২১ সালের পর এটি পোশাক খাতের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজনের হার।
এই হার বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, দেশীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়া। বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অনন্ত গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক খান জানিয়েছেন, ‘আগে জিপার (চেইন) সবই বাইরে থেকে আনতে হতো, এখন আর লাগে না। খুব বেশি বিশেষায়িত কাপড় ছাড়া বাকি সব কাপড়ই স্থানীয় টেক্সটাইল মিল থেকে নিচ্ছেন ক্রেতারা’। ফলে রপ্তানিতে সময় (লিড টাইম) কমছে, যা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় কমলে বাড়তি অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, আর সেই সঙ্গে বাড়ে মূল্য সংযোজনও।
এছাড়া বিশ্ববাজারে তুলা ও সুতার দাম কমানোও ভূমিকা রেখেছে। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, ‘তুলা ও সুতার দাম বৈশ্বিকভাবে কমেছে, যা আগের তুলনায় সস্তা হয়েছে। এটি দেশের ভেতরেও পাওয়া যায়, আবার আমদানিও করা যায়। দেশের ভেতর থেকে নিলে মূল্য সংযোজন বাড়বে, কারণ কাঁচামাল আমদানি খরচ কমবে’। পাশাপাশি ওভেন আইটেমের রপ্তানি বাড়াও এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে, কারণ ওভেন পণ্যে মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলক বেশি।
তবে এই অগ্রগতির পেছনে কিছু অস্বস্তিও আছে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের মূল্য সংযোজনের হার ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৬০ থেকে ৬৪ শতাংশের মধ্যে স্থির থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি ওঠানামা করেছে। ২০২০ সালে এটি ৫৬.৪৯ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। যদিও বর্তমানে তা আবার বাড়ছে, এই অস্থিরতা খাতটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, সিনথেটিক ফেব্রিক্সে এখনো তেমন মূল্য সংযোজন সম্ভব নয়, কিন্তু আমদানি নীতি আদেশে এই খাতের জন্য ৪০ শতাংশ ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার ধার্য করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, এই নীতি প্রণয়নের সময় খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। এছাড়া গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
সরকার ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এর মাধ্যমে পোশাক খাতে ন্যূনতম ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের হার নির্ধারণ করেছে। বন্ডেড ও নন-বন্ডেড সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানি ও পোশাকের ধরন অনুযায়ী এই হার নির্ধারণ করা হয়। অন্তর্বাস ও সিনথেটিক ফাইবারের তৈরি বিশেষায়িত পণ্যে ন্যূনতম হার ৪০ শতাংশ। এই নীতিমালা স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রণীত।
পোশাক খাতের মূল্য সংযোজন বাড়ার এই ধারা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এর অর্থ হলো, প্রতিটি ডলার রপ্তানি আয়ের বেশি অংশ দেশে থেকে যাচ্ছে, যা কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে গেলে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বিশেষায়িত কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের সমাধানও জরুরি, অন্যথায় উৎপাদন খরচ বাড়ার ফলে এই অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

