আমাদের দেশের মানুষ বিনিয়োগের নিরাপদ জায়গা খোঁজেন। মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্র যেন এক আকাশচুম্বী বিশ্বাস। হাতে কিছু টাকা জমলেই অনেকের প্রথম ভাবনা, সঞ্চয়পত্র কিনি। কিন্তু এই সহজ মনে হওয়া বিনিয়োগটিতেও রয়েছে কিছু জটিলতা। পরিকল্পনা না করলে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়ার বদলে লোকসান গুনতে হয় অনেককে। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে জেনে নিন ৫টি সাধারণ ভুল, যা এড়াতে পারলে আপনার বিনিয়োগ হবে সত্যিকার অর্থেই লাভজনক।
১. জরুরি টাকা আটকে ফেলবেন না
অনেকেই হাতে থাকা সমস্ত টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে ফেলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর ইচ্ছে না থাকলেও টাকার প্রয়োজন পড়ে। তখন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্র ভাঙতে হয়; আর ফল? মুনাফা অনেক কমে যায়। সঞ্চয়পত্রের প্রাথমিক মেয়াদ সাধারণত ৩-৫ বছর। যদি মনে হয় কয়েক মাস বা এক বছরের মধ্যেই টাকার দরকার হতে পারে, তাহলে সঞ্চয়পত্র না কিনে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্য কোনো স্বল্পমেয়াদি খাতে টাকা রাখাই ভালো। আপৎকালীন তহবিল সব সময় তারল্য (নগদে রূপান্তরযোগ্য) রাখা উচিত।
২. বিনিয়োগের স্তর বুঝুন
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের একটি সীমা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি এক নামে সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন না। তবে এই সীমা অতিক্রম করলে মুনাফার হার ধাপে ধাপে কমে যায়। তাই যদি আপনার বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে এক নামে সব টাকা বিনিয়োগ না করে পরিবারের সদস্যদের নামে ভাগ করে দিন। স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা বা ভাই-বোনের নামে সঞ্চয়পত্র কিনলে শুধু মুনাফা বেশি পাওয়া যায় না, করের ঝামেলাও কমে। উপহার হিসেবে টাকা দিলে করের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, এটি আইনসম্মত ও বুদ্ধিদীপ্ত একটি পথ।
৩. টিআইএন ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনার খেসারত
অনেকের টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) নেই, অথচ তারা সঞ্চয়পত্র কিনে ফেলেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, টিআইএন ছাড়া সঞ্চয়পত্র কিনলে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ কর কাটা হয়। আর টিআইএন দেখালে করের হার কমে ৫ শতাংশে দাঁড়ায় (বর্তমান নিয়মে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর কর্তন হতে পারে)। টিআইএন থাকলে আপনি কর ফেরতও পেতে পারেন। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে টিআইএন নিন, এটি আপনার অধিকার, আর নিয়মও বটে।
৪. ভুল স্কিম বেছে নেবেন না
সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন ধরন আছে, কোনোটিতে প্রতি মাসে মুনাফা মেলে, কোনোটিতে তিন মাস পর পর, আবার কোনোটি বছর শেষে একযোগে মুনাফা দেয়। নারীদের জন্য ‘পরিবার সঞ্চয়পত্র’ মাসিক মুনাফা দেয়, আবার ‘অর্থবছর সঞ্চয়পত্র’-এ ত্রৈমাসিক মুনাফা পাওয়া যায়। আপনি যদি নিয়মিত আয়ের জন্য সঞ্চয়পত্র কিনছেন, তাহলে মাসিক মুনাফার স্কিমটি আপনার জন্য উপযুক্ত। কিন্তু যদি মেয়াদ শেষে বড় অঙ্কের টাকা পেতে চান, তাহলে সঞ্চয়পত্রটি ভিন্ন। তাই কেনার আগে ভেবে দেখুন; আপনার মুনাফা প্রয়োজন কবে?
৫. সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখবেন না
পুরনো কথা আছে ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা ঠিক নয়’। শুধু সঞ্চয়পত্রে সব টাকা বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি মুনাফাও সীমিত হয়। ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটাতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি এই তিন মেয়াদ মাথায় রেখে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করুন। স্বল্পমেয়াদে ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট, মধ্যমেয়াদে সঞ্চয়পত্র ও দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজার বা মিউচুয়াল ফান্ড, এই ভারসাম্য আপনার আর্থিক ভবিষ্যৎকে মজবুত করবে।
মনে রাখবেন: সঞ্চয়পত্র নিরাপদ বিনিয়োগ, কিন্তু নিরাপদ মানেই সমস্ত টাকা সেখানে রাখা উচিত, এই ধারণা ভুল। পরিকল্পিত বিনিয়োগই পারে আপনার সঞ্চয়কে সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ করতে। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে এই ৫টি ভুল এড়িয়ে চলুন, বিনিয়োগ হোক আপনার পাথেয়, নয় দুশ্চিন্তার কারণ।

