যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন হলেও বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে। তবে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক পোশাক আমদানির তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪৬৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূলত দেশে তৈরি পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়ায় এই পতন হয়েছে।
শুধু জুলাই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
চীনের রপ্তানিতে বড় ধস
জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৪ হাজার ১৮৩ কোটি ডলারে নেমেছে।
এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৪৫৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারতের রপ্তানি কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, নেমে এসেছে ২৪৫ কোটি ডলারে। পাকিস্তানের রপ্তানি ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে হয়েছে ১২৬ কোটি ডলার।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে ৯৩৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি অবশ্য বেড়েছে যথাক্রমে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ ও ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। দেশ দুটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৭৪ কোটি ও ২৬২ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে ভিয়েতনাম এখনো শীর্ষ রপ্তানিকারক। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
শুল্ক সুবিধায় এগিয়ে বাংলাদেশ
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, শুল্কের দিক থেকে অন্যান্য কয়েকটি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বর্তমানে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে রপ্তানি ভালো অবস্থানে থাকলেও পণ্যের দাম কমেছে বলে জানান তিনি। কারণ, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পারস্পরিক শুল্কের একটি অংশ বহন করতে হয়েছে।
শোভন ইসলামের মতে, দেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও ভালো করতে পারে।
এভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন তার অংশ হারাচ্ছে, ফলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরও ভালো করার সুযোগ পেতে পারে। তবে চীনের হারানো বাজারের বড় অংশ বর্তমানে ভিয়েতনাম দখল করছে, আর বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশ পাচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে চলমান জ্বালানি সংকট। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের সংকট অব্যাহত থাকলে এই অবস্থান ধরে রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ক্রেতারাও বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ইতিবাচক ধারাটি ধরে রাখা সম্ভব হবে।
কম উৎপাদন ব্যয় ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি জরুরি
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের অংশ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ আরও লাভবান হতে পারে। তবে এই সুযোগ ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিভিন্ন দেশের জন্য কার্যকর শুল্কহার চূড়ান্ত করার পর পোশাকের ক্রয়াদেশ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা ইতিবাচক।
তবে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে দেশে রপ্তানি আয়ের কতটা অংশ ধরে রাখা যাচ্ছে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ঋণপত্র পাওয়া যেন রপ্তানিকারকদের মূল লক্ষ্য না হয়। কারণ কাপড়, রাসায়নিকসহ কাঁচামাল আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক রপ্তানিকারক ন্যূনতম মুনাফাও করতে পারছেন না।
তার মতে, অনেক রপ্তানিকারক ভবিষ্যতে লাভের আশায় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে পণ্য রপ্তানি করছেন। বছরে ৫০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হলে দেশে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজন বা রপ্তানি মূল্য ধরে রাখার লক্ষ্য থাকা উচিত বলে মনে করে বিজিএমইএ।
যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ফলে দেশটির বাজারে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এতে পোশাক খাতের জন্য একটি বিশেষ শর্ত রয়েছে। ওই শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
এই সুবিধা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের ভেতরে রপ্তানি আয়ের মূল্য সংযোজন বাড়ানোর বিষয়গুলোতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

