দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তৈরি পোশাক, খাদ্য, সিরামিক, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পখাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। উৎপাদন কমানো, কাজের সময়সূচি পরিবর্তন এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে কোনোভাবে কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, লাভের পরিমাণ কমছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বাড়তি এই খরচ বিদেশি ক্রেতা বা দেশের ভোক্তাদের ওপর পুরোপুরি চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, বিদ্যুতের পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের অপচয় কমানোর পাশাপাশি মেশিন চালুর সময় সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তারা।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে বা গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হয়, যা উৎপাদন খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা সাধারণত উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে পণ্যের দাম বাড়াতে রাজি হন না। ফলে বাড়তি খরচের বড় অংশই ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে।
গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রায় দেড় মাস ধরে এই সংকট চলছে। এর ফলে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে গেছে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় নিউএজ গ্রুপ তাদের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বর্তমানে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে। পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে বিকল্প ব্যবস্থা দিয়েও অনিয়মিত জ্বালানি সরবরাহের পুরো ক্ষতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
খাদ্য, পানীয়, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি পণ্য, আসবাব ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতার নিচে কাজ করতে হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকায় থাকা তাদের গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, যেখানে সম্ভব সেখানে এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে গেলে সব উৎপাদন লাইন একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয় না। কিছু লাইন চালু রেখে অন্যগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল বর্তমানে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ৩৫ থেকে ৩৮ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করছে। তবে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ২০০ মেগাওয়াটের বেশি। চলতি অর্থবছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় ১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে সিমেন্ট শিল্পেও। বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ বাড়লেও বাজার পরিস্থিতির কারণে উৎপাদনকারীরা পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, জুন মাসে বিদ্যুতের দাম ১৮ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, কিন্তু পুরো খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
দেশের সিমেন্ট শিল্পে এমনিতেই উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন উৎপাদনের সক্ষমতার বিপরীতে চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টন। এর মধ্যে আগস্ট পর্যন্ত চাহিদা আরও ২ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে।
ফলে ছোট অনেক উৎপাদক ইতোমধ্যে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক আর্থিক সক্ষমতার কারণে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
সিরামিক শিল্পেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানার কিলন (চুল্লি) চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, শুরুতে বাড়তি জ্বালানি খরচের কিছু অংশ ক্রেতাদের ওপর চাপানো সম্ভব হলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, সমস্যা শুধু খরচ বেড়ে যাওয়া নয়, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন করাই সম্ভব হচ্ছে না। কিছু শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থেকে কমে মাত্র ৫ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
সিরামিক পণ্য তৈরিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ কমে গেলে পুরো উৎপাদন ব্যাচ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অনেক উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিয়ে কিলন চালানোর পরিবর্তে তা বন্ধ রাখছেন।
খাদ্য রপ্তানিকারকরাও সংকটে পড়েছেন। বোম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের রপ্তানি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক খুরশিদ আহমেদ ফারহাদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আগস্ট মাসে তাদের ৪৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ডলারের পণ্য অর্ডার পাওয়ার পরও পাঠানো যায়নি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানোর কনটেইনার পরিবহন খরচ বেড়ে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ১২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, যদি একটি চিপসের কনটেইনারের পণ্যের মূল্য ৬ হাজার ডলার হয়, আর পরিবহন খরচই ১২ হাজার ডলার হয়, তাহলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
স্টিল শিল্পও গ্যাস সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন পদ্ধতি পরিবর্তন করছে। বাংলাদেশ স্টিল মিল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, যেসব কারখানা গলিত ইস্পাত থেকে সরাসরি বিলেট তৈরি করে হট রোলিং করতে পারে, তারা সংকটের মধ্যেও স্বাভাবিক উৎপাদনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধরে রাখতে পারছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে যন্ত্রপাতি চালানোর সময় পরিবর্তন করছে।
এদিকে এসিআই কনজিউমার ব্র্যান্ডসের নির্বাহী পরিচালক ও সিওও মো. কামরুল হাসান বলেন, যেসব কারখানায় ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চালু রাখতে হয়, তারা বেশি সমস্যায় পড়েছে। ডিজেল জেনারেটরে উৎপাদন চালালে খরচ অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদনকারী ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তারা দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের দিকে।
তিনি বলেন, “আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌর প্যানেলের দিকে যেতেই হবে। দ্রুত যেতে হবে। এটাই আমাদের একমাত্র পথ।”
ইনসেপ্টা বর্তমানে কারখানা চালাতে প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি, ডিজেল ও গ্রিড বিদ্যুৎ—এই চার ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করছে। শুরুতে গ্যাসচালিত জেনারেটর ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও পরে এমন জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে যা গ্যাস না থাকলে ডিজেলে চলতে পারে। পাশাপাশি বয়লার চালাতেও এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন নয়, দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

