দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি ইউনিট এবার নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির এই ইউনিট থেকে করপূর্ব মুনাফা প্রথমবারের মতো দুইশ কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মূলত চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই এই ব্যাপক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে কেরুর মদ বিক্রির পরিমাণ প্রথমবারের মতো প্রায় পাঁচশ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দশ শতাংশ বেশি। বিক্রির এই উল্লম্ফনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মুনাফাও—আগের বছরের চেয়ে আঠারো শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে করপূর্ব মুনাফা দাঁড়িয়েছে দুইশ চব্বিশ কোটি টাকায়। তবে জুনে অর্থবছর শেষ হলেও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষা এখনো সম্পন্ন হয়নি।
আগের অর্থবছরের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হিসাব করলে দেখা যায়, চলতি বছরের মুনাফা যুক্ত হলে ডিস্টিলারি ব্যবসা থেকে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত আয় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে ২০২১ সালে বিদেশি মদ আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে সরকার। এর ফলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যার সরাসরি সুবিধাভোগী হয় রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠান। আর্থিক হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর নিয়ে টানা চার বছর ধরে ডিস্টিলারি ইউনিটের মোট আয় চারশ কোটি টাকা এবং টানা পাঁচ বছর ধরে নিট মুনাফা একশ কোটি টাকার ওপরে থাকছে।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গণমাধ্যমকে জানান, চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিক্রি বাড়ায় মুনাফাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তবে তিনি একই সঙ্গে উদ্বেগও প্রকাশ করেন—চিনি রিকভারি রেট কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ায় প্রতিষ্ঠানের চিনি ইউনিট এখনো লোকসানে চলছে। চলতি অর্থবছরে এই ইউনিটে প্রায় ষাট কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বাণিজ্যিক খামার ও জৈব সার ইউনিটের মতো অন্যান্য খাতে আয় ধীরে ধীরে বাড়ছে।
চিনি ইউনিটের এই লোকসান ঠেকাতে ইতিমধ্যে একশ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন চিনি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে, যা সম্প্রতি চালু হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভাষ্যমতে, এই ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা গেলে লোকসানের পরিমাণ কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তখন ডিস্টিলারি ইউনিটের করপূর্ব মুনাফা ছিল একশ নব্বই কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে বত্রিশ কোটি টাকা করপোরেট কর হিসেবে পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়ায় একশ আটান্ন কোটি টাকায়। অন্যদিকে চিনি ইউনিট লোকসানে থাকায় সেই খাত থেকে কোনো করপোরেট কর দিতে হয়নি প্রতিষ্ঠানটিকে। করপোরেট করের বাইরেও প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে সরকারকে আবগারি শুল্ক, মূল্যসংযোজন কর, উন্নয়ন তহবিল ফি ও সারচার্জ পরিশোধ করে থাকে।
সব ব্যবসায়িক খাত মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সমন্বিত হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব ছিল চারশ নিরানব্বই কোটি টাকা, আর নিট মুনাফা ছিল সাতানব্বই কোটি টাকা। চিনি ইউনিটের লোকসান সমন্বয়ের কারণেই সামগ্রিক নিট মুনাফার অঙ্কটা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।
বিক্রির প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে চিনি ইউনিটের বিক্রি ছিল প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা, যেখানে ডিস্টিলারি ইউনিটের বিক্রি দাঁড়িয়েছে প্রায় চারশ নব্বই কোটি টাকায়। অর্থাৎ চিনি ইউনিটের বিক্রি প্রায় স্থবির থাকলেও ডিস্টিলারি ইউনিটে দশ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে—আগের বছর যেখানে এই বিক্রি ছিল চারশ চুয়াল্লিশ কোটি টাকা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চিনি ও ডিস্টিলারি বাদে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ব্যবসায়িক শাখার আয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি, কারণ নিরীক্ষার কাজ এখনো চলমান।
প্রতিষ্ঠানটির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঊনিশশ আটত্রিশ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই কোম্পানি ঊনিশশ বাহাত্তর সালে জাতীয়করণ করা হয়। মূলত একটি চিনিকল হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি ডিস্টিলারি গড়ে তোলে, যেখানে আখের চিটাগুড় থেকে দেশীয় অ্যালকোহল উৎপাদিত হয়। দর্শনায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আখের ছোবড়া থেকে জৈব সার উৎপাদনের পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক খামার ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিটও পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ডিস্টিলারি ইউনিটের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করছে, অন্যদিকে চিনি ইউনিটের দীর্ঘমেয়াদি লোকসান একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। নতুন চিনি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চিত্র আরও উন্নত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

