মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে কানাডার তেলক্ষেত্র, চীনের গভীর খনি কিংবা ইউরোপের বরফঢাকা আল্পস—বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত নিরাপত্তা জুতার একটি অংশ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে।
তবে এসব সাধারণ জুতা নয়। ভারী বস্তু, ধারালো যন্ত্রপাতি, পানি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার মতো কর্মক্ষেত্রের নানা ঝুঁকি থেকে পা সুরক্ষিত রাখতে বিশেষভাবে তৈরি করা হয় এসব জুতা।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) তাইওয়ানের মালিকানাধীন রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান সিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেড এসব বিশ্বমানের নিরাপত্তা ও বিশেষায়িত জুতা তৈরি করছে।
এর মাধ্যমে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও কার্যকরী জুতা উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তেলক্ষেত্র—বিভিন্ন কাজে ব্যবহার
সিন চ্যাং মূলত চামড়ার ওপরের অংশ, রাবার ও প্লাস্টিক, পানি প্রতিরোধী এবং অ্যালুমিনিয়ামের অগ্রভাগযুক্ত নিরাপত্তা জুতা তৈরি করে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের জুতার উপকরণও উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
নির্মাণকাজ, তেল ও গ্যাস, রাসায়নিক কারখানা এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে কাজ করা মানুষের জন্য এসব জুতা তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে বিশ্বখ্যাত জুতা ও পোশাক ব্র্যান্ড উলভারিন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড, টিম্বারল্যান্ড এবং ৫.১১ ট্যাকটিক্যাল।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বিভাগের ব্যবস্থাপক টনি হেসিয়েহ ডেইলি সানকে বলেন, সামরিক ধাঁচের এক জোড়া বুটের দাম প্রায় ২২ ডলার। আর উচ্চমানের নিরাপত্তা জুতার দাম ৪০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
২৪ লাখ ডলার থেকে রপ্তানি ১০ কোটি ডলারের বেশি
২০১০ সালে কর্ণফুলী ইপিজেডে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে সিন চ্যাং। তখন প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় ছিল মাত্র প্রায় ২৪ লাখ ডলার।
দেড় দশক পর চট্টগ্রামের কারখানাটিই এখন প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের পণ্য তৈরি ও বিক্রি করছে। গত অর্থবছরে শুধু এই কারখানা থেকেই ১০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। আরও ৩০ শতাংশ রপ্তানি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। বাকি ১০ শতাংশ যায় এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে।
বাণিজ্যবিষয়ক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্রেডমোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু টিম্বারল্যান্ডে সিন চ্যাংয়ের রপ্তানিই ২০২২ সালে ৪ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় থাকা প্রতিষ্ঠানটির দুই কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতাও বেড়েছে। গত বছর যেখানে প্রায় ৩৭ লাখ জোড়া জুতা তৈরির সক্ষমতা ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় ৪২ লাখ জোড়ায় দাঁড়িয়েছে।
টনি হেসিয়েহ বলেন, “গত অর্থবছরে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।”
২০৩৩ সালে ২৩৬০ কোটি ডলারের বাজার
বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি কঠোর হওয়া এবং অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণ বাড়তে থাকায় নিরাপত্তা জুতার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
বিভিন্ন বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, ২০২৩ সালে বিশ্ব নিরাপত্তা জুতার বাজারের আকার ছিল প্রায় ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই বাজার বেড়ে ২ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই বাড়তে থাকা বাজারের বড় অংশ ধরতে বাংলাদেশে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সিন চ্যাং।
বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে প্রতিষ্ঠানটির নয়টি উৎপাদন লাইন রয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে আরও চারটি স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন লাইনগুলো চালু হলে বাংলাদেশে দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার দুই কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ লাখ থেকে ৮০ লাখ জোড়ায় উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করেন টনি হেসিয়েহ। তিনি বলেন, একই সময়ে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ শুরু করেছিল তাদের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ভিয়েতনামে এখন অর্ডার কমছে এবং নতুন কর্মী নিয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা সন্তুষ্ট।
১৪ কর্মী থেকে এখন ১২ হাজার
তাইওয়ানের এই জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সালে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। দুই বছর পর, ২০১০ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডে মাত্র ১৪ জন কর্মী নিয়ে উৎপাদন শুরু করে সিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেড।
এর পরের বছর ২০১১ সালে কুমিল্লা ইপিজেডে দ্বিতীয় উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।
দেড় দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ১৪ থেকে বেড়ে প্রায় ১২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কর্ণফুলী ইপিজেডের দুটি ইউনিটেই তিন শিফটে কাজ করেন প্রায় ৬ হাজার কর্মী। তাঁদের বড় একটি অংশ নারী।
সম্প্রতি সিন চ্যাংয়ের কারখানা পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, সারি সারি কর্মী অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। কেউ চামড়ার জুতার ভেতরে পানি প্রতিরোধী আস্তরণ বসাচ্ছেন, কেউ করছেন শক্তিশালী দ্বিগুণ সেলাই।
দক্ষ কর্মীরা স্বয়ংক্রিয় ও জলচাপচালিত কাটার যন্ত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী উন্নতমানের চামড়া ও কাপড় কাটছেন। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ শেষে আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ দল পণ্য পরীক্ষা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির শুরুর ১৪ বাংলাদেশি কর্মীর একজন দীপঙ্কর দে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। তাঁর কাছে এই কর্মস্থল শুধু চাকরির জায়গা নয়, অনেকটা নিজের ঘরের মতো।
দীপঙ্কর বলেন, গত ১৮ বছরে তাঁরা বাংলাদেশে তৈরি জুতাকে বিশ্বের বাজারে পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন। বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকানে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ লেখা জুতা দেখলে তিনি গর্ব অনুভব করেন।
বাংলাদেশের তৈরি নিরাপত্তা জুতার এই সাফল্য দেখাচ্ছে, রপ্তানি খাতে দেশের সম্ভাবনা শুধু পোশাকশিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষতা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সমন্বয় হলে জুতার মতো অন্যান্য পণ্যও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে।

