স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের শিল্প খাতকে মেধাস্বত্ব, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সম্মেলন কক্ষে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিফট ইন দ্য পোস্ট-এলডিসি ইরা: স্ট্র্যাটেজিস ফর আইপিআর ইস্যুজ অব কি ইন্ডাস্ট্রিজ’ শীর্ষক এক ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজনে যৌথভাবে ছিল ইআরডির ‘সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি)’ এবং ডিসিসিআই।
এলডিসি উত্তরণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে ওষুধ শিল্পে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস (ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) চুক্তির আওতায় এলডিসি দেশগুলো ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ফার্মাসিউটিক্যাল পেটেন্ট থেকে ছাড় পায়। বাংলাদেশ এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে কম খরচে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৮ শতাংশ মেটাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করছে। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর এই ছাড় আর থাকবে না। ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) হিসেবে, শুধু স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে চলবে না; নতুন পেটেন্টযুক্ত ওষুধের ক্ষেত্রেroyalty দিতে হবে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াবে এবং ওষুধের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। এই প্রেক্ষাপটে সেমিনারে বলা হয়, ওষুধ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন পেটেন্ট তৈরি করার ওপর জোর দিতে হবে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে শক্তিশালী মেধাস্বত্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ওষুধ ও তৈরি পোশাকসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে শুধু উৎপাদননির্ভর না রেখে উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং পণ্যের মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিতে দৃশ্যমান সম্পদের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী আইপিআর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে, আর এজন্য আইপিআরের কার্যকর সুরক্ষা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
সেমিনারে বাংলাদেশের বর্তমান আইপিআর ব্যবস্থার কয়েকটি বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দীর্ঘসূত্রতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, পাইরেসি ও নকল পণ্য প্রতিরোধে সীমিত সক্ষমতা এবং ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আইপিআর বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব। এছাড়া পেটেন্ট, নকশা ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের পরীক্ষা কার্যক্রমে ডিজিটালায়নের ঘাটতি এবং ওষুধ ও জীবপ্রযুক্তির মতো বিশেষায়িত খাতে দক্ষ পরীক্ষকের অভাবের কথাও উঠে আসে। এসব সমস্যা মোকাবেলায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে আধুনিক ও কার্যকর ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিস অব বাংলাদেশ (আইপিওবি)’ গঠন, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিশেষায়িত আইপি ট্রাইব্যুনাল গঠন, কাস্টমস ও পুলিশের জন্য বিশেষায়িত আইপিআর প্রশিক্ষণ চালু, পেটেন্ট, নকশা ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের পরীক্ষা কার্যক্রম ডিজিটাল করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যালয় গঠন।
ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর যেসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকার বিস্তারিতভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি সম্প্রতি বলেছেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য এসএমই খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ সরকারের হিসাবে, দেশে ২০২৪ সালে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ১৭ লাখে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এই বিশাল খাতকে শক্তিশালী করে তোলা গেলেই এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই জটিল হয়ে উঠেছে। মূল সূচি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটার কথা ছিল। তবে প্রস্তুতিমূলক সময় যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারায় এবং কোভিড-১৯ মহামারী, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের অস্থিরতার কারণে সরকার আরও তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। ইআরডি সচিবের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, সময় বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের প্রস্তুতিমূলক সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
এলডিসি উত্তরণ শুধু একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। শক্তিশালী মেধাস্বত্ব ব্যবস্থা, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো; এই চারটি বিষয়ে যদি দ্রুত অগ্রগতি না হয়, তাহলে এলডিসি-পরবর্তী যুগে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। তবে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে এই উত্তরণই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

