যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি, আমদানি প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে একই সঙ্গে বড় পরিমাণ আমদানি প্রতিশ্রুতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি, কৃষিপণ্য এবং উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানো।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১৫ বছর মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করেছে। বিমানের পক্ষ থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে এবং আরও কিছু উড়োজাহাজ ইজারা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা আরও ২১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, বড় পরিমাণ আমদানি চুক্তি করার আগে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করে এটিকে বাংলাদেশের জন্য অসম একটি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর বেশি দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে চাপ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সাধারণত বাজারের চাহিদা, মূল্য এবং অর্থনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। কোনো দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আমদানি বা রপ্তানির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব উদ্বেগের সঙ্গে একমত না হয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্য পরিসংখ্যানে দেখা যাবে না। কারণ অনেক চুক্তিই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বিমানের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। ফলে এর আর্থিক প্রভাব ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে দেখা যাবে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা পণ্য সংগ্রহ বাড়ানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির বড় অংশ চীনের ওপর নির্ভরশীল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আঞ্চলিক রাজনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ সব বড় অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
এদিকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প নিয়েও কিছু উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত সক্রিয় উপাদানের বড় অংশ চীন থেকে আসে। চীনা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক শাহাব এনাম খান সতর্ক করে বলেছেন, চীনা সরবরাহকারীদের ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে ওষুধের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও বেড়েছে।
সরকারের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ, শিল্প সক্ষমতা এবং নীতিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আনছে। এখন মূল বিষয় হবে, কীভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া যায়।

