বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর নতুন করে ভর্তুকি প্রতিরোধমূলক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারত। দেশটির বাণিজ্য প্রতিকার সংস্থা বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর সর্বোচ্চ টনপ্রতি ১৪০ দশমিক ০৪ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে।
ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিদপ্তর এই সুপারিশ করেছে। এর আগে বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর নতুন করে ডাম্পিংবিরোধী শুল্ক আরোপের কয়েক দিন পর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো।
ভর্তুকি প্রতিরোধমূলক শুল্ক সাধারণত কোনো দেশের দেওয়া ভর্তুকির প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যে আরোপ করা হয়। ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার সংস্থা বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটপণ্য আমদানির বিষয়ে তদন্ত শেষে এই সুপারিশ করেছে।
ভারতের পাটকল মালিকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং এপি মেস্তা টোয়াইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের ভিত্তিতে গত বছর এই তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরের আমদানি ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তদন্তের আওতায় ছিল পাট সুতা ও দড়ি, পাটের বস্তা ও কাপড়, হেসিয়ান কাপড় ও ব্যাগ এবং কমপক্ষে ৫০ শতাংশ পাট ব্যবহার করা বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্য।
ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিদপ্তরের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর জুট স্পিনিং মিলস লিমিটেড এবং ওরিয়েন্টাল জুট মিলস লিমিটেডের রপ্তানি করা পাটপণ্যের ওপর টনপ্রতি ১০১ দশমিক ৫৪ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশের ২৪টি পাটকল। তাদের জন্য আলাদা শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ছয়টি নির্বাচিত পাটকলকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে টনপ্রতি ১০১ দশমিক ৫৪ ডলার থেকে ১৩২ দশমিক ৩৬ ডলার পর্যন্ত শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে তদন্তে সহযোগিতা করা ১৮টি পাটকলের জন্য এককভাবে টনপ্রতি ১১৬ দশমিক ৪৮ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।
যেসব বাংলাদেশি রপ্তানিকারক তদন্তে অংশ নেয়নি, তাদের জন্য সর্বোচ্চ টনপ্রতি ১৪০ দশমিক ০৪ ডলার শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নেপালের রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে টনপ্রতি ৫৪ দশমিক ৭৭ ডলার থেকে ৬০ দশমিক ৫৪ ডলার পর্যন্ত শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।
ভারতের এই উদ্যোগ এমন সময়ে এলো, যখন দেশটিতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি আগেই কমছে।
ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাটপণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৭ হাজার টনে নেমেছে।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর সর্বোচ্চ টনপ্রতি ৪৪৫ ডলার পর্যন্ত ডাম্পিংবিরোধী শুল্ক আরোপ করে।
নতুন শুল্ক ব্যবস্থার আগে বাংলাদেশ ও নেপালের পাট সুতা, হেসিয়ান কাপড় এবং পাটের বস্তার ওপর টনপ্রতি ১৯ ডলার থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক ছিল।
পরবর্তীতে বাংলাদেশি পাটের বস্তার কাপড়ও এই শুল্কের আওতায় আনা হয়। এর ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানি আরও চাপে পড়ে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮২০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮ শতাংশ বেড়ে রপ্তানি আয় ৮৮৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান বলেন, ভারতের নতুন পদক্ষেপ বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানিতে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদককে ভর্তুকি দেওয়া হয় না, বরং সাধারণত একটি খাতকে সহায়তা দেওয়া হয়। তাই নির্দিষ্ট শিল্পের ওপর ভর্তুকি প্রতিরোধমূলক শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার মতে, ডাম্পিংবিরোধী শুল্ক আরোপের সময় যদি ভর্তুকির বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে একই পণ্যের ওপর আবার ভর্তুকি প্রতিরোধমূলক শুল্ক আরোপ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান তপাশ প্রামাণিকও প্রশ্ন তুলেছেন, ডাম্পিংবিরোধী শুল্ক কার্যকর থাকা অবস্থায় নতুন করে ভর্তুকি প্রতিরোধমূলক শুল্ক কীভাবে আরোপ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এক দশক আগে পাট শিল্প যে ধরনের প্রণোদনা পেত, বর্তমানে সেই সুবিধা আর নেই। তারপরও ভারতের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের উদ্বেগ বিবেচনায় নিচ্ছে না।
তিনি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বাজার বাংলাদেশের পাটপণ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তাই নতুন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বাজার ধরে রাখা এবং পাট শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

