রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য নীতিতে একটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাজ করছে। একদিকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের শুল্ককাঠামো ও নীতিগুলো স্থানীয় উৎপাদকদের বৈশ্বিক বাজারে লড়াই করার চেয়ে সুরক্ষিত অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা করতে বেশি উৎসাহিত করছে। সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রেহান এই বাণিজ্য নীতির নীতিগত বৈপরীত্য ও শুল্ক সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
ড. সেলিম রেহানের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাত (আরএমজি) সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বন্ডেড ওয়ারহাউস সুবিধা এবং কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানির মতো সুবিধা লাভ করা। এটি পোশাক খাতকে একটি বিশেষ কাঠামোর মধ্যে রেখে বিশ্ববাজারের সাথে যুক্ত হতে এবং সস্তা শ্রমের সুবিধা নিতে সাহায্য করেছে। কিন্তু চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক্সের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলো এই ধরনের নীতিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকেছে। এর মূলে রয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ফলে এসব নন-আরএমজি খাতগুলো উচ্চ পরিবহন খরচ, বাণিজ্য অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক এবং নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখোমুখি হচ্ছে।
নিবন্ধে এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে (যদিও জাতিসংঘে তিন বছরের মেয়াদ বাড়ানোর একটি প্রস্তাবনা এখনও চূড়ান্ত প্রক্রিয়াধীন)। এলডিসি উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি বা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধার আওতায় ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কিছু বাড়তি সুবিধা পাবে। তবে সানেমের নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, এই অতিরিক্ত সময়টি একটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র। মূল পরীক্ষাটি হলো, পছন্দসই বাজার সুবিধা সংকুচিত হওয়ার আগেই পোশাক খাতের বাইরে প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব কি না। বাংলাদেশের বর্তমান শুল্ককাঠামোতে প্রথাগত আমদানি শুল্ক কমলেও প্যারা-ট্যারিফ বা সম্পূরক শুল্কের উচ্চহার একটি ‘অ্যান্টি-এক্সপোর্ট বায়াস’ বা রপ্তানি-বিরোধী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মুনাফার সুযোগ তৈরি করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার স্পৃহা কমিয়ে দেয়।
নিবন্ধটিতে বাণিজ্য নীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যকার কাঠামোগত দ্বন্দ্বটিকেও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত বা আমদানি পর্যায়ের শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। একদিকে বাণিজ্য নীতি চায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধার্থে সীমান্ত শুল্ক কমাতে, অন্যদিকে রাজস্ব নীতি চায় এনবিআর যেন সীমান্ত থেকেই বেশি রাজস্ব আদায় করে। এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন শুল্ক সংস্কারে বড় প্রশাসনিক বাধা তৈরি করছে। ড. সেলিম রেহান বলেন, অভ্যন্তরীণ করের আওতা না বাড়ানো, ভ্যাট প্রশাসনের আধুনিকায়ন না করা এবং কর ছাড়ের সংস্কৃতি বন্ধ না করা পর্যন্ত বাণিজ্য শুল্ক কমানোর উদ্যোগ বারবার রাজস্ব সংকটের বাধার মুখে পড়বে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির গুরুত্ব প্রসঙ্গে নিবন্ধে বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আরসিইপি (RCEP) জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির যে ওয়ার্কিং গ্রুপ অনুমোদিত হয়েছে; এগুলো বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কেবল চুক্তি স্বাক্ষর করলেই রপ্তানি বাড়বে না। যদি চট্টগ্রামের বন্দর ব্যবস্থাপনা দ্রুত না হয়, কাস্টমস প্রক্রিয়ার জটিলতা না কমে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হয় এবং মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হয়, তবে আঞ্চলিক এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ সুবিধা বাংলাদেশ পাবে না।
সার্বিকভাবে, বাণিজ্য নীতিতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে ড. সেলিম রেহান সংস্কারের কয়েকটি অগ্রাধিকার ভিত্তিক ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্যারা-ট্যারিফের বিকৃতি দূর করা, শুল্ক সুরক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করা, শিল্প খাতকে ঢালাও সুরক্ষার বদলে প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি সহায়তা পুনর্নির্দেশ করা এবং নন-আরএমজি রপ্তানিকারকদের জন্য বন্ডেড সুবিধা সহজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, পুরনো আমলের সুরক্ষাভিত্তিক নীতি বজায় রাখার মাসুল দিন দিন ভারী হচ্ছে; তাই আগামী দিনের নীতি হতে হবে সুরক্ষাকেন্দ্রীক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতাকেন্দ্রীক।

