বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি আঞ্চলিক বিমান হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন, বড় উড়োজাহাজ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হচ্ছে এই বড় প্রকল্প।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বিমান হাব প্রকল্পে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৮ মাসের একটি বিশেষ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকল্পটির প্রথম ধাপ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের সঙ্গে আকাশ যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বাড়বে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ইতোমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছে প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বিমান হাব প্রকল্পকে উন্নয়ন অর্থায়নের আওতায় নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন উদ্যোগের অধীনে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই আবেদন করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানিয়েছে, বিমানবন্দরের বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও পরিচালনগত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবটি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য পাঠানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান হাবে রূপান্তরের বিষয়ে সরকার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় ও অন্যান্য বিষয় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং বিশেষ করে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পের প্রথম ধাপকে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধাপে এমন একটি অবকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে, যার মাধ্যমে বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক যাত্রী স্থানান্তর এবং বাড়তি পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
এই ধাপে আনুমানিক ২৫০ মিলিয়ন ডলার সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যার প্রধান উৎস হতে পারে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। বাকি ৭৫ মিলিয়ন ডলার সরকার ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক সুবিধা ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার। এখানে দুটি যাত্রী ওঠানামার সেতু এবং ১১টি ছোট আকারের উড়োজাহাজ রাখার স্থান রয়েছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ হাজার টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে বিমানবন্দরটির।
প্রথম ধাপে রানওয়ে ও বিমান চলাচল অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে, দ্রুত বের হওয়ার পথ, রানওয়ের শক্তি বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হবে।
এ ছাড়া বড় আকারের উড়োজাহাজ রাখার জন্য ছয় থেকে আটটি নতুন পার্কিং সুবিধা তৈরি করা হবে। এর ফলে বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৮৭ এবং এয়ারবাস এ৩৩০ ও এ৩৫০ ধরনের বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে টার্মিনালের সম্প্রসারণ ও পুনর্বিন্যাসে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এটি বেড়ে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি যাত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বর্তমান দুটি যাত্রী ওঠানামার সেতুর সঙ্গে আরও চারটি যুক্ত করা হবে। ফলে মোট ছয়টি সেতু থাকবে, যার মধ্যে অন্তত চারটি বড় উড়োজাহাজের জন্য ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক যাত্রী স্থানান্তরের জন্য একটি বিশেষ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারের এই ব্যবস্থায় আলাদা নিরাপত্তা পরীক্ষা, অভিবাসন কাউন্টার এবং অপেক্ষার সুবিধা থাকবে। এতে চট্টগ্রাম শুধু যাত্রা শুরু বা শেষের বিমানবন্দর নয়, বরং আন্তর্জাতিক যাত্রী স্থানান্তরের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারবে।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো পণ্য পরিবহন। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্প এলাকা এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসার কারণে চট্টগ্রামে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের বড় সুযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পণ্য পরিবহনের জন্য আলাদা এলাকা, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং শুল্ক সুবিধাযুক্ত গুদাম তৈরিতে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ হাজার টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বেড়ে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে।
বড় পণ্যবাহী উড়োজাহাজের জন্য বিশেষ পার্কিং এলাকা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে আরও ৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৯ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ভবিষ্যতে বিমানবন্দর, কাস্টমস, বিমান সংস্থা এবং পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করার জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় তথ্য ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে শুধু একটি বিমানবন্দর নয়, বরং একটি সমন্বিত পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা রয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য বিমানবন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ, উড়াল সড়ক এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও আশপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহন করিডোর তৈরির জায়গা রাখা হবে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং তৃতীয় ধাপে ৭০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
পরবর্তী ধাপে দ্বিতীয় রানওয়ে, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কেন্দ্র এবং বছরে ২ কোটি থেকে আড়াই কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসাইন বলেন, বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাবে রূপ দিতে হলে বিমান সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তার মতে, বর্তমানে বিমানবন্দরটি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা রাখে। সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি পণ্যবাহী ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগও রয়েছে। তবে বিমান সংস্থাগুলোকে লাভজনক পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সহায়ক সুবিধা তৈরি হলে চট্টগ্রাম একটি বিকল্প আঞ্চলিক বিমান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানিয়ে আসছে।
১৫ আগস্ট সংগঠনটি অর্থমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক চিঠিতে জানায়, চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর, শিল্প এলাকা ও অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরটি এখনো তার সম্ভাবনার তুলনায় কম ব্যবহার হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বিমানবন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা, আন্তর্জাতিক রুটে ৪০ শতাংশ বিশেষ শুল্ক সুবিধা এবং দীর্ঘ যাত্রার ফ্লাইটে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া বিমান জ্বালানি, স্থানান্তর সুবিধা, পণ্য পরিবহন কেন্দ্র এবং বিমানবন্দরের পাশে বিশেষ গুদাম ব্যবস্থা তৈরির দাবিও জানিয়েছে তারা।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, চট্টগ্রামের কয়েকটি বড় প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। কর্ণফুলী টানেল, উড়াল সড়ক এবং মিরসরাইয়ের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রত্যাশিত গতি না আসায় নতুন প্রকল্পের সফলতা নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক নাঈম হাসান চৌধুরী বলেন, বিমান হাব সফল করতে হলে আগে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কার্যকর করতে হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।
অন্যদিকে বিমান বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্ব, সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে বিমান হাব তৈরির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না। বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতামূলক খরচ, কার্যকর বিপণন এবং নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাবে রূপান্তর করা গেলে এটি শুধু বিমান যোগাযোগ নয়, বরং দেশের রপ্তানি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ পরিচালনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কার্যকারিতার ওপর।

