বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন শুধু দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সাময়িক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগে রূপান্তর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, অর্থনৈতিক ও জলবায়ুজনিত সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরি করবে এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষকে সুরক্ষা দেবে।
রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গোপসাগর সংলাপ ২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনে “সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে: ১০ বছরের সংস্কার ও ভবিষ্যতের পথ” শীর্ষক এক আলোচনায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আয়োজনে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনায় বক্তারা একটি কার্যকর জাতীয় সামাজিক তথ্যভান্ডার তৈরি, সবার জন্য জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক বীমা চালু, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আওতা বাড়ানো এবং দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ব্যয় পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নের এক দশকের অভিজ্ঞতা এবং ব্রাজিল, ভারত ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামাজিক ব্যয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে মানুষ শুধু সহায়তা পাবে না, বরং নিজের সক্ষমতা বাড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যেন সংকটের সময়ে একা না থাকেন, সেই লক্ষ্যেই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এক দশক আগের তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে। একই সঙ্গে শহুরে দারিদ্র্য আরও জটিল হয়ে উঠছে, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এখনো ব্যাপক, আর মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্য ব্যয়, বেকারত্ব ও আকস্মিক আয় হারানোর মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে অনেক পরিবার।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, একজন নাগরিককে যেন বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য একাধিক দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সে লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই ডিজিটাল অবকাঠামো দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সহায়তা পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।
র্যাপিড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, সঠিক পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিবার কার্ড চালু করা হলে সুবিধাভোগী নির্বাচনের ভুল কমানো সম্ভব হবে। তিনি বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় আনা এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও মাতৃত্ব সুরক্ষার মতো সামাজিক বীমা কর্মসূচি দ্রুত দেশব্যাপী চালুর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সরকার সামাজিক নিরাপত্তায় মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ শতাংশ বরাদ্দের যে লক্ষ্য নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে দ্রুত শিল্প অটোমেশন বা প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়লেও শ্রমিকের সংখ্যা একই হারে বাড়েনি। তাই এমন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের এক কর্মক্ষেত্র থেকে অন্য কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময়ও সুরক্ষা দেবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনা করে সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ আগামী দিনে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ধরনে পরিবর্তন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশ পরিচালক ম্যাক্স টুনন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা সুরক্ষা প্রকল্পের পরীক্ষামূলক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এককালীন ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে মাসিক পেনশনভিত্তিক ব্যবস্থা শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে। জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতেও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের প্রধান সৈয়দ হায়দার দেশের সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কারে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেন। এগুলো হলো শিশু কল্যাণ, জলবায়ু সহনশীল সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় প্রশাসন শক্তিশালী করা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং দেশের নিজস্ব অর্থায়ন বৃদ্ধি।
মালয়েশিয়ার সাবেক মন্ত্রী জুরাইদা কামারউদ্দিন তার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তথ্যের পুনরাবৃত্তি ও সমন্বয়হীনতা কমাতে একটি কেন্দ্রীভূত তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি বিদেশফেরত অভিবাসী শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং শহরাঞ্চলে আবাসন নিরাপত্তার ওপরও গুরুত্ব দেন।
মালদ্বীপের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মরিয়ম নাসির বলেন, একজন মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কল্যাণমূলক সেবা পাওয়ার জন্য একটি সমন্বিত একক প্রবেশব্যবস্থা থাকা উচিত। এতে সেবার পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর্যায়ে রয়েছে। শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভাতা দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। এতে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সামাজিক নিরাপত্তাকে যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি শুধু সংকটে থাকা মানুষকে সহায়তা করবে না, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।

