বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের পর ১০৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা বৈধ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। সংগঠনটির দাবি, এই ব্যবস্থায় বন্ধ ও আংশিক বন্ধ স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো আবার চালু করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথও সুগম হবে। এতে আমদানিকারকদের চলতি মূলধন সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও নেই।
রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানায় বিটিএমএ।
সংগঠনটি বলেছে, কটন সুতার বন্ড সুবিধা নিয়ে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের প্রাথমিক বস্ত্র খাত, বিশেষ করে স্পিনিং শিল্পের ৩২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিটিএমএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের অর্থ সুতা আমদানি বন্ধ করা নয়। এতে নতুন কোনো শুল্কও আরোপ করা হয়নি। আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট আদেশে প্রযোজ্য শুল্ক-কর সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সুতা আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
সংগঠনটি জানায়, সাধারণত ব্যাংকগুলো নন-ফান্ডেড এক্সপোজারের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করে। ফলে এ ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের চলতি মূলধন সংকুচিত হওয়ার কথা নয়। এর লক্ষ্য বৈধ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বাধা দেওয়া নয়; বরং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকানো, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষিত রাখা এবং দেশীয় ও আমদানিকৃত সুতার মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা।
বিটিএমএর মতে, দেশের স্পিনিং শিল্পে বিপুল দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বড় উৎপাদন অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান জড়িত। এ খাতের উৎপাদন ও আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা গেলে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। এতে বিদ্যমান কর্মসংস্থান রক্ষার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
শিল্পকারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণের চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি। তাই বিষয়টি শুধু একটি শিল্প খাতের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে বিনিয়োগ সুরক্ষা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত।
রাজস্ব সুরক্ষায় নজরদারির ওপর গুরুত্ব
ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সুতা আমদানির ব্যবস্থায় পণ্য নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা যাচাই এবং আমদানিকারকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিএমএ।
সংগঠনটির ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানির প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া না হলে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন করা যাবে। এতে আমদানি করা সুতা অননুমোদিতভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রির ঝুঁকি কমবে এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষার সুযোগ বাড়বে।
একইভাবে, রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রযোজ্য বিধি অনুসারে রপ্তানি আয় দেশে এসেছে কি না, তা যাচাই করে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার হবে। বিটিএমএর মতে, ডিজিটাল নজরদারি ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা কার্যকর করা গেলে বৈধ রপ্তানি কার্যক্রম সচল রেখেই অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সুতার দাম ও ক্রয়াদেশ স্থানান্তর নিয়ে বক্তব্য
দেশীয় সুতার দাম বৃদ্ধি এবং ভারত ও মিসরসহ প্রতিযোগী দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ চলে যাওয়ার বিষয়ে উত্থাপিত দাবিগুলো নির্ভরযোগ্য ও তুলনাযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করে বিটিএমএ।
সংগঠনটি বলেছে, দেশি ও আমদানি করা একই ধরনের সুতার প্রকৃত ক্রয়ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু পণ্যের দাম বিবেচনা করলেই হবে না। এর সঙ্গে পণ্যের মান ও বৈশিষ্ট্য, পরিবহণ ব্যয়, প্রযোজ্য শুল্ক-কর, ব্যাংক চার্জ, অর্থায়ন ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও হিসাব করতে হবে।
বিটিএমএর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু সুতার দামের ভিত্তিতে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন না। উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মান, প্রযুক্তি, কারখানার সক্ষমতা, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তকেই ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
সংগঠনটি আরও বলেছে, দেশীয় প্রাথমিক বস্ত্র খাত, বিশেষ করে স্পিনিং শিল্পের বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা রক্ষা এবং রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে প্রতিযোগিতামূলক দামে সময়মতো কাঁচামাল সরবরাহ—এ দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়। ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন ও কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে উভয় খাতের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিটিএমএর ভাষ্য, দেশীয় স্পিনিং ও তৈরি পোশাকশিল্প একে অপরের পরিপূরক। দুই খাতের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার শক্তি বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পোন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
সরকারের কাছে বিটিএমএর দুই দাবি
দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রাজস্ব সুরক্ষা এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে দুটি দাবি জানিয়েছে বিটিএমএ।
প্রথম দাবি, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সুতা আমদানির ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা।
দ্বিতীয় দাবি, স্থানীয় মূল্য সংযোজনের জন্য বাস্তবসম্মত নীতিকাঠামো গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে বন্ড সুবিধার বাইরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানিতে ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান, রুলস অব অরিজিন এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে টু-স্টেজ ট্রান্সফরমেশনসংক্রান্ত শর্ত বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিটিএমএ। সংগঠনটির প্রস্তাব, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের জন্য পর্যায়ক্রমে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ন্যূনতম স্থানীয় মূল্য সংযোজন অর্জনের উপযোগী নীতিকাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।

