বাংলাদেশের জন্য উপসাগরীয় ছয় দেশের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বাজারে প্রবেশের সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমদানি শুল্ক কমাতে হলে সরকারের রাজস্বে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক সমীক্ষার বরাতে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়া হলে বছরে সর্বোচ্চ ১,৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ঝুঁকি সামলাতে সংবেদনশীল পণ্য ও সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে এমন পণ্যে ৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখার সুপারিশ করেছে সমীক্ষাটি।
রাজস্বের এই হিসাবের বিপরীতে রয়েছে বড় একটি বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন নিয়ে গঠিত জিসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ব্যবধান এখনো উল্লেখযোগ্য। বিটিটিসির সমীক্ষার তথ্য হিসেবে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিসিসি থেকে বাংলাদেশ ৫৬৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে রপ্তানি করেছে ৬৮ কোটি ৯২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য। এই দুই অঙ্কের ব্যবধান প্রায় ৪৯৫ কোটি ডলার। জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশই জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য।
সমীক্ষায় ধারণা দেওয়া হয়েছে, চুক্তি কার্যকর হলে জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানি আরও প্রায় ২০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার বাড়তে পারে। আমদানি বাড়লে পণ্যের সরবরাহ ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সুবিধা তৈরি হতে পারে, তবে শুল্ক ছাড়ের ফলে সরকার কতটা রাজস্ব হারাবে, তা নির্ভর করবে কোন কোন পণ্য চুক্তির আওতায় আসবে এবং সেগুলোর শুল্ক কীভাবে কমানো হবে তার ওপর। তাই এক ধাপে সব পণ্যের শুল্ক তুলে দেওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। এতে একদিকে সরকারের রাজস্বের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ সীমিত করা যাবে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদকদের নতুন প্রতিযোগিতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া সম্ভব হবে।
রপ্তানি বাড়ানোর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি তৈরি পোশাক খাত। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো প্রায় ১ হাজার ৩৫৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা এই বাজারে এখনো উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতে পারেননি। জিসিসির দেশগুলোতে আমদানি শুল্কের গড় হার তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশ সেই সুবিধাকে বড় রপ্তানি আয়ে রূপ দিতে পারেনি। ফলে চুক্তি স্বাক্ষর করলেই বাজার পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ, ক্রেতাদের চাহিদা, বিপণন ও প্রতিযোগী দেশের সক্ষমতাও রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তৈরি পোশাকের বাইরেও হালাল খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, গৃহসজ্জার কাপড়, সিরামিক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিটিটিসির সমীক্ষা নিয়ে আলোচনায় জিসিসির পণ্য আমদানিতে গড় সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের শুল্কহার ৫ দশমিক ০৩ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে। কৃষিপণ্যে এই হার ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং অকৃষি পণ্যে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে এগুলো গড় হার; সব পণ্যে একই হারে শুল্ক আরোপ করা হয়, এমন নয়। আর চুক্তিতে শুল্ক সুবিধা পেলেও বাংলাদেশি পণ্যের জন্য বাজারে প্রবেশের অন্যান্য শর্ত পূরণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকবে।
চুক্তির আলোচনায় শুধু শুল্ক নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জিসিসির সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও জিসিসির মধ্যে ২০২২ সালে সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জিসিসির ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই পক্ষের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ওই সমঝোতা স্মারকের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এখন প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রভাব মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনুমোদন মিললে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জিসিসির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হবে। শিল্প, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, প্রবাসীকল্যাণ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে সম্ভাব্য চুক্তির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে মূল্যায়ন দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আলোচনার মূল প্রশ্ন শুধু চুক্তি হবে কি না, তা নয়; কোন পণ্যে কতটা শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে, কোন খাত সুরক্ষা পাবে এবং সম্ভাব্য রপ্তানি আয় কীভাবে রাজস্বের ঘাটতি সামলাতে সাহায্য করবে, তার হিসাবও আগে স্পষ্ট করতে হবে।

