পূজার ছুটিতে রাজধানী প্রায় ফাঁকা। ক্রেতা কম থাকায় নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা কমবে বলে আশা ছিল। কিন্তু শুক্রবার সকালে রাজধানীর মেরাদিয়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, উল্টো চিত্র। দাম কমেনি, বরং কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সামনের সপ্তাহে সয়াবিন তেলের দাম আবার বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাজার করতে এসেছিলেন বনশ্রীর এফ ব্লকের বাসিন্দা আশরাফুল। ছুটির কারণে অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন, তাই দাম কিছুটা কম পাবেন বলে ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু বাজারে এসে দেখেন, কয়েক দিন আগে যে রুই মাছ কিনেছিলেন কেজিপ্রতি ৩৫০ টাকায়, আজ তার দাম চাওয়া হচ্ছে ৩৮০ টাকা। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৩০ টাকা। আশরাফুল বলেন, আয়ের সঙ্গে সংসারের খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষ্য, ব্যবসায়ীরাও জানাচ্ছেন, আগামী সপ্তাহে সয়াবিনের দাম বাড়তে পারে।
আরেক ক্রেতা জসিম উদ্দিনের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, গায়ে মাখার সাবান থেকে মুলা, কোনো কিছুর দামই নাগালের মধ্যে নেই। আটা-ময়দা, মাছ কিংবা সবজি, কোথাও স্বস্তি মিলছে না। আরেক ক্রেতা মনসুর আহমেদ জানান, তেলাপিয়া মাছ কেজিতে ৩০০ টাকার বেশি, ছোট মাছ প্রায় ৫০০ টাকা। তাঁর কথায়, সবকিছু মেনে নিয়েই চলতে হচ্ছে।
সবজির বাজারে দাম মোটামুটি স্থির আছে। তবে এটিও স্বস্তির খবর নয়। কারণ, শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। সাধারণত এ সময়ে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমে। এবার তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বাজারে খোঁজ নিয়ে সবজির দাম পাওয়া গেছে এ রকম: প্রকারভেদে বেগুন ১০০, ১৪০ ও ১৮০ টাকা কেজি। পটল ৮০ টাকা, ঝিঙা ১০০, চিচিঙ্গা ৮০, করলা ১০০, পেঁপে ৪০, সিম ১৬০, টমেটো ১৬০ ও শসা ১২০ টাকা কেজি। ভেন্ডি ৬০ টাকা, বরবটি ১০০, মুলা ৮০, কাঁচা মরিচ ১৬০, আলু ৪০ ও রসুন ১২০ টাকা কেজি। ফুলকপির পিসপ্রতি দাম ৮০ টাকা। লাউ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়।
মুদিপণ্যে গত কয়েক দিনে বড় ধাক্কা লেগেছে। দুই কেজি ময়দার দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। প্যাকেট আটা ৬৫ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা। চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। সব ধরনের গায়ে মাখার সাবানের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। হুইল পাউডারের কেজি ১৪৫ থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, আর হুইল সাবান ৩০ থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে। আদা ১৬০ থেকে বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। রসুন ১৮০ থেকে বেড়ে ২০০ টাকা। মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকা এবং চিকন ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। পোলাওয়ের চাল ২০০ টাকার কাছাকাছি। খোলা চালের মধ্যে সবচেয়ে কম দামের গুটি স্বর্ণা ৫০ টাকা। একমাত্র ব্যতিক্রম ডিম। ডজনে ১০ টাকা কমে এখন ১৪০ টাকা।
প্রোটিনের বাজারেও চাপ আছে। গরুর মাংস ৮২০ টাকা কেজি। ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা, কক ৩৩০ ও দেশি মুরগি ৬৬০ টাকা। মাছের মধ্যে রুই আকারভেদে ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা। পাঙাশ ও তেলাপিয়া ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সয়াবিন তেল নিয়ে। বর্তমানে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, লিটারে ১৪ থেকে ১৫ টাকা বাড়তে পারে। তাহলে পাঁচ লিটারের দাম গিয়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৭০ থেকে ১ হাজার ৯০ টাকায়। রাসেল জেনারেল স্টোরের মালিক রাসেল খান বলেন, গায়ে মাখার সাবান, হুইল পাউডার, পেস্ট, আটা ও ময়দাসহ সব পণ্যের দামই বেড়েছে। সয়াবিনের দাম বাড়তে পারে বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাড়তি দামে কিনে আনলে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। মেরাদিয়ার সবজি বিক্রেতা আরিফের মতে, দ্রব্যের দাম কমবে বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর যুক্তি, তাঁদেরও টিকে থাকতে হবে।
বাজারের এই চিত্র থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। ছুটির সময় ক্রেতা কমলেই দাম কমে না, কারণ দামের বড় অংশ নির্ধারিত হয় সরবরাহ ব্যয় ও পাইকারি বাজারের ওপর। খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা আগেই বেশি দামে পণ্য কিনছেন, ফলে সেই চাপ ক্রেতার ঘাড়েই পড়ছে। মুদিপণ্যের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনের জিনিসে দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে সরাসরি টান পড়ে। সয়াবিনের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপকে আরও বাড়াবে।
শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে, এমন আশা আছে। কিন্তু আপাতত বাজারে সেই লক্ষণ নেই। ক্রেতাদের কাছে বাজারে যাওয়া এখন আর স্বস্তির বিষয় নয়, বরং প্রতিদিনের হিসাব কষার চ্যালেঞ্জ।

