ঢাকার প্রতিটি গলিতেই একসময় থাকত নিজস্ব একটি মুদি দোকান। টিনের চালা কিংবা বাঁশের বেড়া দেওয়া ছোট সেই দোকানে মিলত চিপস, মিমি চকলেট, ডিম, সিগারেট থেকে শুরু করে বিস্কুটের প্যাকেট পর্যন্ত। কিন্তু এসব দোকান শুধু কেনাকাটার জায়গা ছিল না। পাড়ার প্রাণস্পন্দন ধরে রাখার কেন্দ্রও ছিল এগুলোই। আজকের বিক্রিবাট্টার ব্যস্ত শহরে সেই দোকানগুলোর স্মৃতি ফিরে দেখলে বোঝা যায়, একটি ছোট দোকান কীভাবে একটি পুরো এলাকার সামাজিক বুনন ধরে রাখতে পারে।
সকালে ঘরে ডিম ফুরিয়ে গেলে বারান্দা থেকে হাঁক দিলেই হতো। দোকানি নিজেই পাঠিয়ে দিতেন। প্রতিবেশীদের দেখা-সাক্ষাৎ, গল্পগুজব আর পাড়ার খবর ছড়ানোর ঠিকানাও ছিল এই দোকান। অনেক পরিবারের হিসাব রাখা হতো খাতায়। মাস শেষে টাকা মেটানোর রেওয়াজ ছিল, আবার কেউ কেউ দেরিতেও দিতেন। বাকি শোধের জন্য কোনো চাপ ছিল না। দোকানি ও ক্রেতার মধ্যে কাজ করত এক অলিখিত আস্থা।
এই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে লেখক ফিরে গেছেন নিজের শৈশবে। তাঁর প্রথম মিষ্টির নেশা ছিল লেবেনচুস। কাচের বয়ামে রাখা সেই টক-মিষ্টি ফলের স্বাদের লজেন্স দোকানি হাত ঢোকালেই ঝনঝন শব্দ করত, আর রঙিন মোড়ক আলো পেয়ে ঝিলিক দিত। মাত্র এক টাকায় মিলত কয়েন বিস্কুট, মিমি চকলেট কিংবা সিনেমা হলের চিপস। সেই চিপসের মচমচে স্বাদকে তিনি আনন্দের সঙ্গেই তুলনা করেছেন।
পুরান পল্টনের ঝিমধরা দুপুরগুলো আজও তাঁর চোখে স্পষ্ট। নিমপাতা দুলছে, সিলিং ফ্যানের একঘেয়ে গুঞ্জন চলছে, আর ভাইবোনেরা চুপিচুপি ছুটছে পাড়ার দোকানে। সেখানকার দোকানি ছিলেন এক রাগী বৃদ্ধ, যাঁকে ওরা দুষ্টুমি করে ডাকত কানা মামা। চোখে কম দেখলেও মেজাজে তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ। একবার মুখের ওপর ওই নামে ডাকায় তিনি লাঠি হাতে লেখকের ভাইয়ের পেছনে গলিতে ধাওয়া করেছিলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে নানির বাড়িতে ফিরে আসা সেই ভাইয়ের দুষ্টুমি চালের বস্তা, কেরোসিন আর খোলা বিস্কুটের টিনের গন্ধের সঙ্গে স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
পরের প্রজন্মেও একই ছবি। লেখকের ছেলে বড় হয়েছে বাসার নিচের দোকান ঘিরে। আয়া তাকে সেখানে নিয়ে যেতেন চিপস আর লজেন্স কিনতে। তত দিনে পছন্দের তালিকায় ঢুকেছে আলুর ক্র্যাকার ও আমদানি করা কিটক্যাট। ধীরে ধীরে দোকানির সঙ্গে ছেলের গড়ে ওঠে আন্তরিক সম্পর্ক। শেষ পর্যন্ত যখন তাঁরা সেই বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান, তখন দোকানি ছেলেকে বিদায়ী উপহার হিসেবে একটি ছোট ব্যাগভর্তি খাবার তুলে দেন। লেখকের ভাষায়, সেই আচরণ পরিবারের সদস্যের মতোই কোমল মনে হয়েছিল।
আজও সেই বন্ধন অটুট। উত্তরায় লেখকের মুদি দোকানি সোহেল নিজেকে অতিথিদের কাছে পরিচয় দেন ‘আপার লোকাল ব্যাংকার’ হিসেবে। কারণ তিনি বিকাশের এজেন্টও। লেখক দেশের যেখানেই থাকুন, সোহেলকে একটি ফোন করলেই হয়। ফিরে আসা পর্যন্ত বিল তিনিই মিটিয়ে রাখেন। এই আস্থাই ছোট দোকানগুলো গড়ে তোলে। এগুলো যেন নীরব জীবনরেখা, যেখানে শুধু পণ্য নয়, মেলে নিশ্চয়তা, চেনা মুখের উষ্ণতা আর একাত্মতার অনুভূতি।
মুদি দোকানের সঙ্গে ঢাকার টং সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। টং আলাদা এক ধরনের নির্ভরতার জায়গা। সেখানে মানুষ থামে চা, সিগারেট, কলা বা পাউরুটি নিতে, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসে টিমটিমে টিভির সামনে। সেটি মূলত অবসর ও মেলামেশার কেন্দ্র। আর মুদি দোকানের ভূমিকা ঘরোয়া প্রয়োজনের সমাধানদাতার।
লেখকের মতে, মুদি দোকানের ওপর এই নির্ভরতা কেবল মুদিসদাইয়ের জন্য ছিল না, ছিল নিশ্চয়তার জন্য। শৈশবের লজেন্স, কৈশোরের টুকিটাকি খাবার কিংবা পূর্ণবয়স্ক জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, সবকিছুতেই একই বিশ্বাসের সুতো জড়িয়ে আছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে। ঢাকার অস্থির, বিস্তৃত শহরে যেখানে প্রতিবেশীরাও প্রায়ই অপরিচিত থেকে যান, সেখানে এই দোকানগুলো হয়ে উঠেছে ভরসার নোঙর। অফিসের ক্লান্তিকর বৈঠকে আটকে থাকলেও ঘরের কোনো জরুরি সংকট মিটে যাবে, এই নিশ্চয়তা মিলত, কারণ দোকানি পরিবারের খুঁটিনাটি পছন্দ-অপছন্দ আগে থেকেই জানতেন।
আজকের ঝকঝকে সুপারশপ আর উজ্জ্বল আলোর সারি চোখ ধাঁধাতে পারে, কিন্তু স্মৃতি ও বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠতার জায়গা নিতে পারে না। গলির মোড়ের নিরীহ মুদি দোকান তাই সুপারশপ সংস্কৃতির কাছে হারিয়ে যাওয়ার নয়, এমনটাই মত লেখকের।
এই আস্থা কখনোই লেনদেনভিত্তিক ছিল না, বরং ছিল সহজাত। শৈশবের বাকি আর বিনা চাপে ফেলে রাখা দেনার ভেতর দিয়েই তা গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সেই বিশ্বাসও পরিণত হয়েছে। ছোটবেলায় যে ভরসা ছিল দোকানি প্রিয় লজেন্সটি মনে রাখবেন, বড় হয়ে তা-ই রূপ নিয়েছে চাল, সাবান কিংবা বিল পরিশোধের মতো কাজও নির্ভাবনায় সামলে দেওয়ার নিশ্চয়তায়। মুদি দোকান তাই টিকে আছে, শুধু পণ্য নয়, জীবনের বুনটে মিশে থাকা এক আত্মিক বন্ধন বহন করেই।

