একসময় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান পরিচিতি ছিল তুলনামূলক কম দামের টি শার্ট, ট্রাউজার ও সাধারণ পোশাক। সেই পরিচিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। দেশের কারখানাগুলো এখন বিশেষায়িত জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের গাউন ও কারিগরিভাবে উন্নত পোশাক তৈরির কার্যাদেশও পাচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক বছরে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাংলাদেশে উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এই অগ্রগতির প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝার জন্য রপ্তানির পরিসংখ্যান, উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদক রিয়াদ হোসেনের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের এই পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জার্মান পোশাক ব্র্যান্ড হাকরো গত ছয় মাস ধরে টিম গ্রুপের একটি কারখানা থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে। একই সময়ে ডেনমার্কের বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহকও বাংলাদেশের একটি পোশাক প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে ট্রাউজারসহ তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্যের কার্যাদেশ দিয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, কারহার্ট, মন্টবেল ও ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও গত কয়েক বছরে সরাসরি অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানায় কাজ দিয়েছে। তবে প্রতিযোগিতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের নাম প্রকাশ করতে চায় না।
বাংলাদেশের উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানির সুনির্দিষ্ট আকার নিয়ে এখনো একক ও সর্বজনস্বীকৃত পরিসংখ্যান নেই। পোশাকশিল্পের কয়েকজন উদ্যোক্তার হিসাবে, মোট পোশাক রপ্তানির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এখন উচ্চমূল্যের পণ্য হতে পারে। কেউ কেউ এই অংশ ২০ শতাংশের কাছাকাছি বলে মনে করেন। বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমানের হিসাবে, এক দশক আগে মোট রপ্তানিতে প্রিমিয়াম পোশাকের অংশ ছিল আনুমানিক ৩ শতাংশ, যা এখন প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। বিজিএমইএর পরিচালক ও রপ্তানিকারক শেখ মুস্তাফিজের বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি এক দশক আগের প্রায় ২০০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। এসবই শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব, সরকারি কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান নয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে তুলনামূলক নির্দিষ্ট কয়েকটি উন্নত পোশাক শ্রেণি বিবেচনা করা হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে করা ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল পোশাক ও স্যুটের সম্মিলিত অংশ ছিল বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। একই শ্রেণির পণ্যের অংশ বিশ্ববাজারে ছিল ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের গুরুত্ব যতটা, বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এখনো তার তুলনায় অংশ অনেক কম। তবে এই হিসাবের পণ্য শ্রেণি এবং উদ্যোক্তাদের বলা উচ্চমূল্যের পোশাকের সংজ্ঞা এক নয়। তাই দুই ধরনের হিসাবকে সরাসরি সমান ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে বিজিএমইএর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়। এই আয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাক থেকে এলে তার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৮৭ কোটি থেকে ৫৮১ কোটি ডলার। ফলে এই বাজারের অংশ বাড়াতে পারলে বিদ্যমান রপ্তানি কাঠামোর মধ্যেই আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু বেশি দামের পণ্য তৈরি করলেই সেই সুবিধা নিশ্চিত হবে না। পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয়, সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতার চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্য থেকে এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায়। টিম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান আসিফের তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটি বছরে প্রায় ১২ কোটি ডলারের জ্যাকেট ও অন্যান্য আউটারওয়্যার রপ্তানি করে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ উচ্চমূল্যের পণ্য। গ্রুপটির মোট বার্ষিক রপ্তানি আয় ৩০ কোটি ডলারের বেশি। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত ইউবিএফ ব্রাইডাল বিয়ের গাউন ও সংশ্লিষ্ট পোশাক তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি আয় ৫০ লাখ ডলারের বেশি ছিল, যার প্রায় পুরোটাই উচ্চমূল্যের পোশাক থেকে এসেছে। আন্তর্জাতিক খুচরা বাজারে প্রতিষ্ঠানটির তৈরি বিয়ের পোশাকের দাম ৪০০ থেকে ১ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এনার্জিপ্যাক ফ্যাশনসও এই বিশেষায়িত বাজারে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের বার্ষিক পোশাক রপ্তানির মূল্য প্রায় ১০ কোটি ডলার, যার প্রায় ৯০ শতাংশ স্যুট ও ব্লেজার। কিছু ব্লেজার আন্তর্জাতিক খুচরা বাজারে ৯০০ ইউরো পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বাজারে কোনো পোশাকের খুচরা মূল্যই বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নয়। ব্র্যান্ড, আমদানিকারক, পরিবেশক ও বিক্রেতার খরচ ও মুনাফা যোগ হয়ে খুচরা মূল্য তৈরি হয়। ফলে এসব উদাহরণ বাংলাদেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বোঝায়, প্রতিটি পণ্য থেকে দেশের প্রকৃত আয় নয়।
উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির জন্য শুধু ভালো কাপড় কিংবা বেশি দাম যথেষ্ট নয়। পোশাকের নকশা, সেলাইয়ের সূক্ষ্মতা, বিশেষায়িত উপকরণ, ফিনিশিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো পোশাকের খুচরা মূল্য ৫০ ডলারের বেশি হলে সেটিকে উচ্চমূল্যের বলে বিবেচনার প্রবণতা রয়েছে। কেউ কেউ উৎপাদনের সময় ও জটিলতাও বিবেচনা করেন। তবে সব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য একই সংজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। ব্র্যান্ডের বাজারমূল্য ও ক্রেতাদের কাছে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতাও এর অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
উচ্চমূল্যের পোশাকে আগ্রহ বাড়ার পেছনে ব্যবসার হিসাবও কাজ করছে। অনন্ত গার্মেন্টসের পরিচালক রিজওয়ান জাহির খানের বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ পোশাকে মুনাফার হার ২ থেকে ৩ শতাংশে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপরীতে, প্রিমিয়াম পোশাকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এটি তাঁর ব্যবসায়িক মূল্যায়ন, পুরো শিল্পের নিশ্চিত গড় মুনাফা নয়। তবে শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রেক্ষাপটে কেন উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজন হয় এমন পণ্যে যেতে চাইছেন, তা এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর একটি অংশ চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক দেশে উৎপাদন ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে, যা ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ নামে পরিচিত। চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ উচ্চমূল্যের পোশাকের প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারী। এসব বাজারে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজার প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। স্থানীয় রপ্তানিকারকদের মতে, বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করা কিছু ব্র্যান্ডের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক হওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন কার্যাদেশ পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির পরিচিতি এখনো মূলত কম দামি ও সাধারণ পোশাকের সরবরাহকারী হিসেবে। এই ধারণা বদলাতে সময় লাগে, কারণ উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্রেতারা কেবল উৎপাদন খরচ দেখেন না, বরং মানের ধারাবাহিকতা, কারিগরি দক্ষতা, নকশা ও সময়মতো সরবরাহের নিশ্চয়তাও চান। পাশাপাশি উন্নত মানের কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতিও শিল্পসংশ্লিষ্টরা বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার মধ্যে ঠিক কতটি উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করে, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের ধারণা, এ ধরনের উৎপাদনে যুক্ত কারখানার সংখ্যা ১০০ ছাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ রয়েছে, কিন্তু এই বাজারের প্রকৃত আকার ও অগ্রগতি নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রয়োজন। শুধু বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ পাওয়া নয়, দেশীয়ভাবে দক্ষতা তৈরি, উন্নত উপকরণ ব্যবহারের সক্ষমতা, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোই হবে পরবর্তী ধাপ। সাধারণ পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ধরে রেখেই প্রিমিয়াম পণ্যের অংশ বাড়াতে পারলে রপ্তানি আয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উভয়ই জোরদার হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তব করতে হলে বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্যের বাইরে গিয়ে পুরো শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তথ্যসূত্র ও কৃতিত্ব: এই সংবাদে শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ এবং কারখানাভিত্তিক তথ্যের মূল সূত্র হিসেবে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে রিয়াদ হোসেনের ২৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে। রপ্তানি আয়ের তথ্য বিজিএমইএর প্রকাশিত পরিসংখ্যান এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের বৈশ্বিক অংশের হিসাব বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।

