দেশে পুষ্টিকর ফল খাওয়া ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। আপেল, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতির মতো আমদানি করা ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নিয়মিত ফল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, এসব ফলের ওপর শুল্ক-কর বাড়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফল আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ফল আমদানি থেকে সরকারের আয় ছিল ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অথচ একই সময়ে ফল আমদানির পরিমাণ কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ৮ লাখ টন ফল আমদানি হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে।
অর্থাৎ, আমদানি কমলেও শুল্ক-কর ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে। তবে এর চাপ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
ফলের ওপর শুল্ক-কর ১২২ শতাংশ
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি ও আনারের মতো ফলের ওপর আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করসহ মোট করভার ছিল ৮৯ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ শতাংশে।
অর্থাৎ, ১০০ টাকার আমদানি মূল্যের ফলের বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ক-কর মিলিয়ে করভার দাঁড়াচ্ছে ১২২ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন, সংরক্ষণ, ব্যবসায়িক ব্যয় ও মুনাফা যুক্ত হলে খুচরা বাজারে দাম আরও বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ফলের শুল্ক-কর বেশি। আপেল ও নাশপাতির ক্ষেত্রে ভারতে করভার ৬০ থেকে ৬১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ, নেপালে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাল্টা ও দেশি ফলের দামও বেড়েছে
রাজধানীর বাজারে মাল্টার দাম বৃদ্ধির চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রতি কেজি মাল্টা ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায়। গত সেপ্টেম্বরে কোনো কোনো বাজারে দাম ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
শুধু আমদানি করা ফল নয়, দেশি ফলের দামও বেড়েছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে এক হালি সাগর কলার দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। বর্তমানে তা কিনতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা লাগছে। চায়ের দোকানে একটি সাগর কলার দামও ১৫ টাকা পর্যন্ত।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমদানি করা ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশি ফলের ওপর চাহিদা বাড়ার সুযোগ তৈরি হলেও দেশি ফলের দামও কম থাকছে না। ফলে ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
পুষ্টির চাহিদা পূরণে বাধা
ফল শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজন অনুযায়ী ফল কিনতে পারছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল গড়ে ৪৫ গ্রাম। ২০১৬ সালে তা কমে ৩৬ গ্রামে নেমে আসে। ২০২২ সালের জরিপে আবার বেড়ে ৯৫ দশমিক ৪ গ্রাম হয়। তবে ২০২২ সালের পর নতুন জরিপ না হওয়ায় বর্তমানে মানুষ গড়ে কতটা ফল খাচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুষ্টিবিদ ও বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক এস কে রায় বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ৪০০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় পরিমাণ ফল খেতে পারছেন না।
তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের মানুষ মাছ, মাংস ও ডিমের মতো খাবারও কম খাচ্ছেন। এর ফলে ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা নিয়ে প্রশ্ন
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তাজা ফল আমদানির শুল্ক-কাঠামো পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, ফলের ওপর উচ্চ কর আরোপের ফলে পুষ্টিকর খাবার সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেসব ফলের পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন দেশে নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার যুক্তিও সীমিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ করের কারণে বৈধ আমদানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে দাম আরও বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। তাঁর মতে, ডলার-সংকটের সময় শুল্ক-কর বাড়ানোর যে যুক্তি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
শুল্ক কমানোর সুপারিশ
ফলের দাম কমাতে শুল্ক-কর পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ৩ অক্টোবর ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর কমিশনকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল। গত মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ফলের কর কমানোর বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কাজ চলছে। তবে কী হারে কর কমানো হবে বা কখন সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
ফলের দাম কমাতে শুধু শুল্ক-কর সমন্বয় নয়, আমদানি, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হতে পারেন।
সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও পুষ্টিকর খাবার সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা জরুরি। ফলের ওপর করনীতি এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে একদিকে রাজস্বের বিষয়টি বিবেচনায় থাকে, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারও সাশ্রয়ী দামে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারে।

