ভোক্তাদের জন্য পণ্যের পরিসর বাড়াতে, বাণিজ্যিক আয় বাড়াতে এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমাতে আগামী নভেম্বর থেকে প্যাকেটজাত হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া ও চা বিক্রির পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। চায়ের বিক্রির অনুমোদনও ইতিমধ্যে মিলেছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বাণিজ্যিক পণ্যের পরিসর বাড়ানো হচ্ছে। সাবান ও ডিটারজেন্ট বিক্রি আগেই শুরু হয়েছে। নভেম্বরেই চা বাজারে আনার আশা করছেন তিনি। এ ছাড়া আটা বিক্রির পরিকল্পনাও আছে। বাজারের চাহিদা যাচাইয়ে জরিপ চলছে। ফল ইতিবাচক হলে আরও নতুন পণ্য যুক্ত করা হবে।
আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের আয় বাড়িয়ে ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়াই টিসিবির লক্ষ্য। ইতিমধ্যে কাপড় কাচার সাবান, গোসলের সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি শুরু হয়েছে। এসব পণ্য প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি হলেও সংগ্রহমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ভোক্তারা কম দামে পণ্য পাচ্ছেন, আবার টিসিবিও সামান্য মুনাফা করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে সংস্থাটির মুনাফা হয়েছে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
চেয়ারম্যান জানান, পণ্যের পরিসর বাড়িয়ে এক কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারলে টিসিবির প্রায় ৭০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় বা আর্থিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত আয় নির্ভর করবে বিক্রির পরিমাণ ও পরিচালন দক্ষতার ওপর।
বর্তমানে নতুন বাণিজ্যিক পণ্যের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে টিসিবি। চলতি অর্থবছরে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য আছে। আগামী অর্থবছরে গ্রাহক এক কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, মাত্র চার মাস আগে নতুন পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে এবং গ্রাহকদের সাড়া মোটামুটি ভালো।
ভোক্তাদের জন্য একটি আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। নতুন পণ্য বিক্রির কারণে বিদ্যমান ভর্তুকির পণ্যের দাম বাড়বে না। সরকার বর্তমানে ভর্তুকিতে যেসব পণ্য বিক্রি করছে, সেগুলোর দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। নতুন পণ্য কেনা বা না কেনার সিদ্ধান্ত ভোক্তার ওপরই থাকবে। নতুন পণ্যগুলোর দামও প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম থাকবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
টিসিবি একসঙ্গে সব পরিবর্তন না এনে ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল নিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, ভোক্তারা যেন টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্র থেকেই এক জায়গায় নিয়মিত প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ নিত্যপণ্য কিনতে পারেন। চেয়ারম্যানের হিসাবে, নিয়মিত কম দামে কিনতে পারলে একটি পরিবারের বছরে কয়েক হাজার টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
এদিকে স্মার্ট কার্ডভিত্তিক বিতরণের বাইরে ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনিসহ নিত্যপণ্য বিক্রির সুযোগও খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে ভোজ্যতেল বিক্রির একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চলছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির জন্য সম্ভাব্য ডিলারদের কাছ থেকে আবেদনও আহ্বান করা হয়েছে।
অর্থায়ন ও পরিচালন ব্যয় কমাতেও পদক্ষেপ নিয়েছে টিসিবি। ব্যাংকঋণের বদলে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কেনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কম সুদের প্রস্তাব দেওয়া বেসরকারি ব্যাংকের সেবা নেওয়া হচ্ছে এবং এপিআইয়ের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে বিক্রির অর্থ জমা নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। পরিবহন, ওঠানো-নামানোসহ অন্যান্য ব্যয় কমাতে আঞ্চলিক গুদাম থেকে সরাসরি পণ্য বিতরণও শুরু হয়েছে।
চেয়ারম্যান বলেন, শুধু খরচ কমিয়ে ভর্তুকির বোঝা কমানো সম্ভব নয়, আয়ও বাড়াতে হবে। তাঁর ভাষ্য, ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী দাম বজায় রেখেই ভর্তুকি কমাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।
পেঁয়াজ ও আলুর বিষয়ে তিনি জানান, টিসিবি এসব পণ্য সারা বছর নিয়মিত কেনে না। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার প্রয়োজন মনে করলে তবেই কেনা হয়। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পেঁয়াজ কেনা হয়েছিল। এখন পেঁয়াজের সংকট নেই বলে নতুন করে কেনার পরিকল্পনাও নেই।
সব মিলিয়ে টিসিবি এখন শুধু ভর্তুকির পণ্য বিতরণকারী সংস্থা না থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দিকেও এগোচ্ছে। এই পথে সংস্থাটির আয় বাড়লে ভর্তুকির চাপ কমতে পারে, তবে সাফল্য নির্ভর করবে বিক্রির পরিমাণ, মান ও পরিচালন দক্ষতার ওপর। নভেম্বরে মসলা ও চা বাজারে এলে ভোক্তারা কতটা সাড়া দেন, সেদিকেই নজর থাকবে।

