থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যের আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি এসব পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। থাইল্যান্ড প্রস্তাবগুলো বিবেচনার আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরুর অনুরোধ জানিয়েছে দেশটি।
গত ৩০ অক্টোবর থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে চতুর্থ পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ (এফওসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। অন্যদিকে থাই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব একসিরি পিন্তারুচি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি যোগাযোগ, শ্রমিক অভিবাসন, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হয়। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল দুটি। প্রথমত, থাইল্যান্ড যেন বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি করে। দ্বিতীয়ত, থাই বাজারে এসব পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে আমদানি শুল্ক কমানো হয়। থাইল্যান্ড প্রস্তাবগুলো বিবেচনা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে বৈঠকে শুল্ক কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি নৌযোগাযোগকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে উভয় পক্ষ। গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম ও থাইল্যান্ডের রানং বন্দরের মধ্যে প্রথম সরাসরি নৌপরিবহন সেবা চালু হয়েছে। এ রুটে পণ্য পরিবহনে সময় প্রায় ১৫ দিন থেকে কমে চার দিনে নেমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য সরবরাহের সময় কমার পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও থাইল্যান্ডের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। দেশীয় ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণে দেশটির কারিগরি সহায়তা ও বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হালাল খাদ্যের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আতিথেয়তা, নার্সিং, উদ্ভিদের জার্মপ্লাজম ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। থাইল্যান্ড তাদের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে।
এ ছাড়া চাল আমদানি ও শ্রমিক অভিবাসনসংক্রান্ত আলোচনাধীন সমঝোতা স্মারকগুলো চূড়ান্ত করার বিষয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করেছে। জ্বালানি খাতে সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় কৃষিজাত অবশিষ্টাংশ ও কৃষিশিল্পের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনেও এ ধরনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও থাইল্যান্ডের সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আগ্রহ এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে যোগ দেওয়ার প্রচেষ্টার কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে থাইল্যান্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মানব পাচার, অস্ত্র পাচার, মাদক পাচার ও অনলাইন প্রতারণার মতো আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ।

