মোকাম থেকেই সিন্ডিকেট করে বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে এখনো সাড়ে তিন লাখ টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজ ১৫ দিনের মধ্যে বাজারে চলে আসলেও দাম কমার সম্ভাবনা আছে।
কিছু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। তারা মনে করেন, সরকারের উচিত দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানির অনুমোদন দেওয়া। সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তার পকেট থেকে অপ্রয়োজনীয় টাকা যাচ্ছে। দাম বেশি থাকায় অনেক ক্রেতা কম করে কেনাকাটা করছেন। গতকাল বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দিন বলেন, “অনিয়ন্ত্রিত মজুতদারি থাকলে তার সমাধান করা হবে। দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ বাজারে চলে আসবে। আমাদের সিদ্ধান্ত সবসময় সামগ্রিক অর্থনীতি, কৃষক ও ভোক্তা সবাইকে বিবেচনায় রেখে নিতে হয়। এটি কোনো তৎপর সিদ্ধান্ত নয়। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিছুদিনে কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকা দামের বৃদ্ধি যৌক্তিক কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অবশ্যই যৌক্তিক নয়। কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেনি। এই বাড়তি মূল্যের টাকা কৃষকের কাছে যায়নি।” বশিরউদ্দিন আরও জানান, “গত বছর প্রায় ৪০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। তার একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। সব পেঁয়াজ সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা যায় না। আমরা ১০ হাজার হাইফ্লো মেশিন দিয়েছি, যা কিছুটা সাহায্য করেছে। বর্তমানে তৈরি হওয়া সংকট সাময়িক, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যাবে।”
দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ৩২-৩৫ লাখ টন। উৎপাদন হয় প্রায় ৩৮ লাখ টন। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। বছরে আমদানি হয় ৬-৭ লাখ টন। তবু প্রতি বছর শেষ সময়ে দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যায়। গত ১৫ দিনে কেজি প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে এখন ১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর পেঁয়াজের মৌসুম প্রায় শেষ। কয়েক দিন পরই বাজারে উঠবে ‘মুড়িকাটা পেঁয়াজ’। জানুয়ারিতে সিজনের নতুন পেঁয়াজে বাজার সয়লাব হবে। এই মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের কাছে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আছে, তা দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হাতে থাকা পেঁয়াজ ধরে রেখে, বাজারে সংকটের গুজব ছড়িয়ে মুনাফা অর্জন করছেন। শেষ মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে সিজনের শেষ মুনাফা লুটছেন তারা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. শরিফ বলেন, “বছরের এই সময়ে হালি পেঁয়াজের মজুত কমে যায়। মুড়িকাটা পেঁয়াজও উঠতে শুরু করে না। এ সুযোগে মোকামের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেন। বেশি দামে কিনতে হয়, বিক্রি কমে যায়। ফলে লাভও কমে।”
মিরপুর ৬ নম্বর কাঁচাবাজার থেকে পেঁয়াজ কেনার সময় চাকরিজীবী নাহিদ আহমেদ বলেন, “হঠাৎ করে দাম বেড়ে গেছে। এখন ১২০ টাকা কেজি। আগের মতো ১ কেজি কিনি না, আধা কেজি কিনছি। সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, না হলে ভোক্তার ভোগান্তি বাড়বে।” নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. আকবর অভিযোগ করেন, “মৌসুম শেষ। কেউ খারাপ পেঁয়াজ নিতে চায় না। ভালো পেঁয়াজ আমরা প্রতি কেজি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় কিনি। বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে। বর্তমানে লাভ নেই।” খুচরা বিক্রেতাদের মতো রাজধানীর পাইকারি বিক্রেতারাও অভিযোগ করেন, মোকাম থেকেই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদ বলেন, “মোকাম থেকেই সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। খুচরা বাজারে ৫-১০ টাকা কমবেশি করে বিক্রি হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, “বাড়তি টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। আমরা শুধু কেজিতে দেড় টাকা কমিশন পাই। এই অবস্থায় আমদানি করলে কৃষকের ক্ষতি হবে।”
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, “দেশে সাড়ে তিন লাখ টনের মতো পেঁয়াজ মজুত আছে। চলতি মাসে আসবে ৮৫ থেকে ৮৭ হাজার টন মুড়িকাটা পেঁয়াজ। আগামী মাসে আসবে আড়াই লাখ টন। এরপর বাজারে নিয়মিত সরবরাহ থাকবে। বাণিজ্য উপদেষ্টাও বলেছেন, দাম না কমলে আমদানি করা হবে। তবে আমরা কৃষকের ক্ষতি করতে চাই না। তাই আমদানিতে কিছুটা দেরি হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “২ হাজার ৮০০ জন পেঁয়াজ আমদানি করতে আবেদন করেছেন। ১০০ টন করে অনুমতি দিলেও প্রচুর আমদানি হবে। তাই আমরা বাজার পর্যবেক্ষণ করছি। দাম না কমলে হয়ত আমদানির দিকে যেতে হবে।”
এফবিসিসিআই জানিয়েছে, রমজান মাসে পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে প্রায় ৫ লাখ টন হয়। দেশি উৎপাদন ও মজুতের কারণে কোন ঘাটতির কথা নেই। তবে গত বছরও এ সময়ে দেশি পেঁয়াজের খুচরা দাম বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পেঁয়াজ আমদানি ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ৫ শতাংশ সাধারণ শুল্ক থাকায় বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তা প্রত্যাহার করে। পরে আমদানির অনুমোদন স্থগিত করা হয়। সরকার বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দিয়ে থাকে।

