চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এবার বর্ষা শুরুর আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নগরজুড়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আসন্ন বর্ষার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৭ ও ২৮ এপ্রিল বৈশাখের বৃষ্টিতেই বন্দরনগরীর প্রধান এলাকা পানির নিচে চলে যায়।
গত ২৮ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরীতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বুকসমান পানি জমে যায় এবং ২-৩ ঘণ্টা ধরে দুর্ভোগ চলতে থাকে। এর আগের দিন, ২৭ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টায় ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই নগরীর নিম্নাঞ্চল হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে কয়েক ঘণ্টায় ১৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় বলেও উল্লেখ রয়েছে।
পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত চট্টগ্রাম প্রাকৃতিকভাবে একটি বৈচিত্র্যময় শহর। পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসচেতনতার অভাব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষায় ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরীর প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। একটি গবেষণায় (আকতার ও অন্যান্য, ২০২২) বলা হয়, পানির গভীরতা এক মিটার হলে নগরের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়িতে পানি প্রবেশ করে।
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় অনেক খাল ও নালায় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হিজড়া ও জামালখান খালে প্রায় ৩০টি বাঁধ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বহদ্দারহাট, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খালের কাজ চলমান থাকায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ হলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় হিজড়া খালের অগ্রগতি ৬০ শতাংশে সীমিত রয়েছে। শুধু এই খালেই প্রায় ২০টি বাঁধ রয়েছে, যা সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতাকে আরও তীব্র করেছে।
চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন প্রায় ২৫০০-৩০০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০০-১২০০ টন বর্জ্য নিয়মিতভাবে অপসারণ না হয়ে নালা, খাল ও রাস্তায় থেকে যায়। এতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে জমে নদীর তলদেশ ভরাট করছে এবং দূষণ বাড়াচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বহু পুকুর, দিঘি ও জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের এমফিল গবেষণায় (মোরশেদ ও তৈয়ব চৌধুরী, ২০১৮) বলা হয়, নগরীতে ৪১টি ওয়ার্ডে ১৩৫২টি জলাশয় চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে এগুলো কমে যাচ্ছে।
জলাশয়গুলো পানি ধারণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এসব হারিয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগরী জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। খাল, নালা ভরাট, প্লাস্টিক বর্জ্য, পলি জমা এবং অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।
জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামে নাগরিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। যানবাহন চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ে শহরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নালা ও খালে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা। গত ৭ এপ্রিল বাকলিয়া থানার ভেড়া মার্কেট এলাকায় চাক্তাই খালে পড়ে ১০ বছর বয়সী শিশু রাকিবের মৃত্যু হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরীতে নালা ও খালে পড়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কারণগুলো কী কী: বিশ্লেষণে জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত হয়েছে—
- অল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত
- খাল ও নালায় বাঁধ দিয়ে চলমান উন্নয়ন কাজ
- পুকুর ও জলাশয় ভরাট
- প্লাস্টিক ও বর্জ্য জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া
- জোয়ারের প্রভাব ও পলি জমা
- অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে—
- খাল ও নালার বাধা চিহ্নিত করে অপসারণ
- আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন
- সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত কার্যক্রম
- দখলকৃত খাল ও নালা উদ্ধার
- পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ
- জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে স্লুইসগেট স্থাপন
- খালে বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ
- পাহাড় কাটা বন্ধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সংকট। সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

