চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর প্রায় দুই মাস পর ভুটানের পরীক্ষামূলক ট্রানজিট চালান খালাস করা হয়েছে। বুধবার রাতে ভুটানের পণ্য খালাসের জন্য নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রতিনিধি চালানটি খালাস করেন। এখন এটি সড়কপথে বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে রওনা হয়েছে। বুড়িমারী থেকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে চালানটি ভুটানে পৌঁছে দেওয়া হবে।
চালানটি নেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে সই হওয়া ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য মুভমেন্ট অব ট্রাফিক-ইন-ট্রানজিট’ চুক্তি ও প্রটোকলের আওতায়। এই চুক্তি ও প্রটোকল সই হয়েছিল ২০২৩ সালের ২২ মার্চ। ভুটান সমুদ্রবন্দরহীন দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে তিনটি পরীক্ষামূলক ট্রানজিট চালান খালাস হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২০ সালের পর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চারটি ট্রানজিট চালান খালাস হলো।
ভুটানের চালানটি এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। মোট ওজন ৬ হাজার ৫৩০ কেজি। চালানে রয়েছে শ্যাম্পু, শুকনা পাম ফল, আইস টি, চকলেট ও জুস। রপ্তানিকারক থাইল্যান্ডের অ্যাবিট ট্রেডিং কোম্পানি। চালানটি আমদানি করেছে ভুটানের অ্যাবিট ট্রেডিং। দুই মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছলেও সরকারি অনুমোদনের কারণে খালাস করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদনের পর বুধবার চালানটি খালাস করা হয়।
ভুটানের পণ্য খালাসের জন্য নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রতিনিধি এন এম ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল আলম খান জানান, গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় কনটেইনার পরিবহনকারী একটি প্রাইম মুভার ট্রেলারে চালানটি বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে রওনা হয়েছে। সেখান থেকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কনটেইনারটি ভুটানে পৌঁছে দেওয়া হবে।” বাংলাদেশের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক এই ট্রানজিট সফল হলে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে পারে। তবে তা নির্ভর করছে ভুটানের আগ্রহের ওপর।
রাজস্ব আয় লাখ টাকা:
ভুটানের পরীক্ষামূলক ট্রানজিট চালান খালাসের মাধ্যমে সরকারি সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য আয় করেছে। ট্রানজিট চালান খালাস প্রক্রিয়ায় যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক কনটেইনারের চালান থেকে তিনটি সরকারি সংস্থা ফি ও মাশুল আদায় করেছে। কাস্টমস মাশুলসহ ৬৮ হাজার ৮৭৪ টাকা পেয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেয়েছে ১৬ হাজার ৭৯২ টাকা। সব মিলিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৮৫ হাজার ৬৬৬ টাকা।
সরকারি সংস্থা ছাড়াও বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল আদায় করেছে ১৬ হাজার ৪৭ টাকা। জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো, ইয়ার্ডে স্থানান্তর ইত্যাদি সেবার জন্য এই মাশুল নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি তিন সংস্থা এই ট্রানজিট চালান থেকে ১ লাখ ১ হাজার ৭১৩ টাকা আয় করেছে। ট্রানজিট চালানের কনটেইনার বন্দরে ২১ দিন বিনা ভাড়া রাখা যায়। এর বেশি সময় থাকলে ভাড়া দিতে হয়। তবে ভুটানের পরীক্ষামূলক চালানটি দুই মাসের বেশি সময় বন্দরে থাকার পরও বাড়তি ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে। চালানে রয়েছে ৬ হাজার ৫৩০ কেজি শ্যাম্পু, শুকনা পাম ফল, আইস টি, চকলেট ও জুস।
বেসরকারি খাতও আয় করেছে:
ভুটানের পরীক্ষামূলক ট্রানজিট চালান থেকে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও আয়ের সুযোগ পেয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে পরিবহন ভাড়া ও খালাসের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা বাবদ আয়। তবে বেসরকারি খাতের মোট আয় কত তা জানা যায়নি। চালানটি দীর্ঘ সময় বন্দরে থাকায় শিপিং লাইনকে ‘ডিটেনশন’ ফি দিতে হচ্ছে। চালানের নথি অনুযায়ী, কনটেইনারটি ২১ দিনের মধ্যে বন্দরে খালাস করা হলে কোনো ফি দিতে হতো না। কিন্তু ২১ দিন অতিক্রম করায় ৩ হাজার ৭৮০ ডলার ‘ডিটেনশন’ ফি ধার্য করা হয়েছে।
ভুটানের চালানটির শিপিং এজেন্ট টি আই টু শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেদুল ইসলাম বলেন, “সাধারণত ১৪ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস হলে কোনো ‘ডিটেনশন’ ফি নেওয়া হয় না। ট্রানজিট চালানের ক্ষেত্রে ২১ দিন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে খালাস হলে এই ফি দিতে হতো না।”
ট্রানজিট চালান থেকে কত আয় হয়েছিল:
চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ভুটানের আগে ভারতের তিনটি পরীক্ষামূলক ট্রানজিট চালান আনা হয়েছিল। ভারতের প্রথম চালানটি নেওয়া হয়েছিল ২০২০ সালের জুলাইয়ে। চার কনটেইনারের ওই চালান থেকে কাস্টমস ও বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৫৮ হাজার ৯০০ টাকা। এরপর ২০২২ সালে ভারতের আরও দুটি পরীক্ষামূলক চালান খালাস করা হয়। এছাড়া মোংলা বন্দর দিয়েও দুইটি চালান পরিবহন হয়েছে। ভারতের পাঁচটি পরীক্ষামূলক চালান পর ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়মিত ট্রানজিট চালানের স্থায়ী আদেশ জারি করেছিল। তবে পরীক্ষামূলক চালানের পরও নিয়মিত ট্রানজিট পণ্য পরিবহন শুরু হয়নি।
ট্রানজিট চালানে সরকারি সংস্থার আয় নির্ভর করে পণ্যের পরিমাণ ও কনটেইনারের সংখ্যার ওপর। কাস্টমস, মহাসড়ক বিভাগ ও বন্দরের আদায়কৃত মাশুল মূলত চালান ও পণ্যের পরিমাণ অনুযায়ী ধার্য করা হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ভুটান নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করলে দেশটির আমদানিকারক ও ভোক্তারা লাভবান হবে। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতেও আয় হবে। ভারতের সঙ্গে নিয়মিত ট্রানজিট পথ আগে খুলেছিল। তবে তা ব্যবহার হচ্ছে না। এখন ভুটানের ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে কোনো প্রতিবন্ধকতা যেনো না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

