বেনাপোল স্থলবন্দরে বাণিজ্য গত এক বছরে মারাত্মকভাবে কমেছে। সরকারের পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের আশা অনুযায়ী বৃদ্ধি হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ ক্রমেই নেমে আসছে।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ১৪ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি কমেছে ৭৫ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন। একই সময়ে রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন। রেলপথের বাণিজ্যও ২৯ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।
ইতিহাসে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৪ লাখ ৪৫ হাজার টন, ২০২১-২২ সালে ২১ লাখ ১৪ হাজার টন, ২০২০-২১ সালে ২৬ লাখ ৪৪ হাজার টন এবং ২০১৯-২০ সালে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি ছিল ২০ লাখ ১১ হাজার ৬ টন। বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের আগে বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন ভারতীয় পণ্য আমদানি হতো ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক। বাংলাদেশি পণ্য ভারতে রপ্তানি হতো ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক। কিন্তু ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, যা বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে। সরকারের পরিবর্তনের পর ভারত তিন দফায় বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, আমদানি-রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দ্রুত প্রত্যাহার না হলে বড় ধরনের বাণিজ্য ও রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হবে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকার চাইলে বাণিজ্য বৈঠকে এসব বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। বেনাপোল স্থলবন্দরে বাণিজ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতের একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি-রপ্তানি কমেছে। সরকারি পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতি আশা মতো হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতা বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে।
গত ৮ এপ্রিল ভারতের নিষেধাজ্ঞায় সড়ক পথে ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৭ মে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, সুতা, প্লাস্টিক ও কাঠের তৈরি পণ্য, ফল ও ফলজাত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর আগে ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে ভারত থেকে সুতা, নিউজপ্রিন্ট, সিগারেট পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, ক্রাফট পেপার, আলু, গুঁড়া দুধ, টোব্যাকো, রেডিও-টিভি যন্ত্রাংশ, সাইকেল, ফরমিকা শিট, সিরামিকওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার, স্টেইনলেস স্টিলওয়্যার, মার্বেল স্ল্যাব-টাইলস এবং মিক্সড ফেব্রিক্সের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত না হলে বছর শেষে বড় ধরনের বাণিজ্য ও রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে। গত অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় বেনাপোল বন্দরে আমদানি কমেছে ৬ লাখ ৩১ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন, রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন। রেলপথেও বাণিজ্য কমেছে ২৯ হাজার মেট্রিক টন।
বেনাপোল সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, “সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয়। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও ভারত যেন বাণিজ্য নীতিতে স্থিতিশীল থাকে—এটাই প্রত্যাশা।”
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, “ভারতের একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। বাংলাদেশও কয়েকটি পণ্যে আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এতে জরুরি পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে আমদানি-রপ্তানি কমে গেছে।”
ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান জানান, “স্থলপথে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে চান। তবে বন্দরগুলোর অনুন্নত অবকাঠামো বাণিজ্য বিস্তারে বাধা দিচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান (বিবিআইএন) স্থলবাণিজ্য চুক্তিও কার্যকর হয়নি। যেসব বন্দরের চাহিদা বেশি, সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর উন্নয়নে সরকারের নজর দেওয়া জরুরি।”
বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার আয়নাল হাসান জানান, “সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর রেলপথে এসিআই মোটরস ভারত থেকে ১০০টি ট্র্যাক্টর আমদানি করেছে। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢাকা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।”
বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালক শামিম হোসেন বলেন, “গত ২৫ নভেম্বর বেনাপোল দিয়ে ভারত থেকে ২৪৩ ট্রাক পণ্য আমদানি হয়েছে এবং বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৫ ট্রাক। নিষেধাজ্ঞার কারণে বাণিজ্য কমেছে, তবে আসা পণ্য দ্রুত খালাসে সহায়তা করা হচ্ছে। সীমান্তে বাণিজ্য বৈঠক বন্ধ থাকায় অনেক সমস্যা সমাধানে দেরি হচ্ছে। তবে দুই দেশের সরকার চাইলে আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে।”

