প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে ভারতের বন্দরগুলোতে সীমিত প্রবেশাধিকার মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি বছর থেকে ভারতের বেশিরভাগ স্থলবন্দর ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় এবং পণ্য অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সমস্যায় পড়েছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছিল। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে তা দ্বিগুণ হবে কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে রপ্তানি এখন সেই বিলিয়নের ঘরেই আটকে রয়েছে, বরং কিছুটা কমেছে।
একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। ধরুন, আপনি পল্টনের বাসা থেকে অফিসে যাওয়া ঠিকমতো করতে পারেন না। বরং যেতে হচ্ছে রামপুরা-বাড্ডা হয়ে উত্তরা, তারপর মেট্রোরেলে মিরপুর, ফার্মগেট, শাহবাগ হয়ে অফিসে। প্রতিদিন এই যাত্রা যন্ত্রণাদায়ক মনে হবে। একইভাবে, ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রতিটি রপ্তানিকারক কোম্পানি এখন আরও জটিল ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য।
আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং মাইদুল ইসলাম বলেন, “সুবিধাজনক বন্দরগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে খরচ ও লিড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেকে সহ্য করতে না পেরে রপ্তানি বন্ধ করেছে।” ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের তিন পাশে ভারতের অবস্থান থাকলেও খাদ্যপণ্য এখন শুধু একপাশ দিয়ে যায়। আগে ঢাকা থেকে সরাসরি রুটে কেক, চিপস, বিস্কুট, আসবাব, ড্রিংকস ও প্লাস্টিকপণ্য ভারতে পৌঁছাত। জনপ্রিয় রুটগুলো ছিল:
- ঢাকা-বাংলাবান্ধা-শিলিগুড়ি (প্রায় ৪৭৫ কিমি)
- ঢাকা-বুড়িমারী-কোচবিহার (প্রায় ৪৫১ কিমি)
- ঢাকা-আখাউড়া-আগরতলা (প্রায় ১২৮ কিমি)
- ঢাকা-চাতলাপুর-করিমগঞ্জ (প্রায় ৩০৮ কিমি)
- ঢাকা-শেওলা-করিমগঞ্জ (প্রায় ২৮৮ কিমি)
- ঢাকা-তামাবিল-শিলং-গৌহাটি (প্রায় ৪৬৮ কিমি)
নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন পণ্যের জন্য প্রায় চার থেকে পনেরো গুণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-ভোমরা-কলকাতা-শিলিগুড়ি-গৌহাটি-করিমগঞ্জ-আগরতলা (প্রায় ১,৯০০ কিমি) বা ঢাকা-সোনামসজিদ-শিলিগুড়ি-গৌহাটি-করিমগঞ্জ-আগরতলা (প্রায় ১,৬০০ কিমি) হয়ে যেতে হবে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “স্থলবন্দর বন্ধের পরে আমাদের পণ্য পরিবহনের খরচ সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়েছে। খরচ সামঞ্জস্য করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
রপ্তানিকারকরা জানান, পূর্বে হবিগঞ্জের কারখানার পণ্য ত্রিপুরায় পৌঁছাতে ১৫৬ কিমি, মিজোরামে সর্বোচ্চ ৩৫০ কিমি পথ পাড়ি দিত। এখন সেই পথ হাজার কিমি ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তিনটি স্থলবন্দর দিয়ে এখনই রপ্তানি সম্ভব। পণ্য কলকাতায় পৌঁছে তারপর শিলিগুড়ি, এরপর সাতটি রাজ্যে বিতরণ হয়। নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে রপ্তানি খরচ ও সময় কয়েকগুণ বেড়েছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, “ভারতের সিদ্ধান্তের পরপরই আমরা সচিব পর্যায়ের মিটিংয়ের জন্য অনুরোধ করেছি। কোনো সাড়া মেলেনি। চিঠি-পত্র দিয়েছি, উত্তর পেলে পুনরায় কথা বলা যাবে।” ভারতের বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। আগের সরাসরি বন্দর রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও খরচ ও সময় বেড়েছে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট দেবাশীষ রায় বলেন, “আগে ছয়টি বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ১৮–২৫ হাজার রুপিতে এক ট্রাক পণ্য পৌঁছে দিতে পারতো। এখন কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে আগরতলা পাঠাতে প্রায় এক লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ লাগছে।”
রপ্তানিতে ভারতের সাতটি রাজ্যের বাজারে ভারতে স্থানীয় পণ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যেরও আধিক্য ছিল। সুবিধাজনক বাজারে সহজে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ বন্ধ করতে ভারত এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা। সর্বশেষ, সরকারি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ছয় মাস ধরে দেখা যায়নি। কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হলেও তা এখন স্তিমিত হয়ে গেছে।

