দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী সংকটের অন্যতম কারণ ছিল বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও ক্রমাগত রিজার্ভ ক্ষয়। এই দুই সংকটের তীব্রতা কমাতে রফতানি ও প্রবাসী আয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে রেমিট্যান্সে উত্থান থাকলেও রফতানি আয় বাড়ছে না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, গত মাসে রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪.২৫ শতাংশ কমেছে।
চলতি অর্থবছরে রফতানি খাতে টানা পাঁচ মাস ধরে প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে, গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২ হাজার ৪৫৩ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি কমেছে ২.১৯ শতাংশ।
বিশ্ব বাণিজ্যে চলতি অনিশ্চয়তা দেশের রফতানি খাতে প্রভাব ফেলেছে। ইপিবির কর্মকর্তা ও বাণিজ্য অংশীজনরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) বাংলাদেশের রফতানি হ্রাসে বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্কের কারণে চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপীয় বাজারে কম দামে পণ্য রফতানি করছে। এতে বাংলাদেশ ইউরোপের কিছু বাজারে নিজের অংশ হারাচ্ছে।
তবে রফতানি কমার পেছনে অভ্যন্তরীণ কারণও কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের আর্থসামাজিক পরিবেশ ব্যবসা-বিনিয়োগের অনুকূলে নেই। জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মব সহিংসতা সব মিলিয়ে ব্যবসায়িক গতি শ্লথ হয়েছে। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগে মানুষ নিরুৎসাহিত। যারা ইতিমধ্যেই ব্যবসা করছেন, তারাও সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। উপরন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এটি কেবল কাঁচামাল আমদানি বা পণ্য রফতানির জন্য নয়, ভারতের স্থলবন্দরও বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেও পড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
গত বছরের ৪ জানুয়ারি ভারত তৃতীয় দেশে পণ্য রফতানির জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া দীর্ঘদিনের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে। ফলে বাংলাদেশ ভারতীয় স্থলবন্দর ব্যবহার করে বন্দর বা বিমানবন্দর থেকে তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠাতে পারছে না। এছাড়া ভারত স্থলবন্দর ব্যবহার করে সুতা আমদানি নিয়েও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এতে পণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে সময় বেড়েছে এবং কিছু বিশ্ববাজারের ক্রেতা হারিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে সুবিধাজনক বাণিজ্যিক সমঝোতা করতে বাংলাদেশ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। যদি কূটনৈতিক সম্পর্ক অদূর ভবিষ্যতে উন্নত না হয়, বৈদেশিক বাণিজ্যে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রফতানি খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাংলাদেশের রফতানি মূলত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর। ফলে পোশাক রফতানি কমে গেলে সার্বিক রফতানির প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব পড়ে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট পণ্য রফতানির ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। এ খাতে প্রথম ছয় মাসে রফতানি কমেছে ২.৬৩ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যখন বিশ্বের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ পাল্টা শুল্কের প্রভাব সামাল দিতে বড় আকারের প্রণোদনা দিচ্ছে, বাংলাদেশ বিভিন্ন সুবিধা ও নগদ সহায়তা প্রত্যাহার করেছে। ফলে অন্য দেশগুলো উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে পণ্য রফতানি করতে পারছে, বাংলাদেশ তা করতে পারছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রফতানি প্রবৃদ্ধি পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে সামগ্রিক পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে আর্থসামাজিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, আগামী নির্বাচিত সরকার এলে অনিশ্চয়তার অনেকটাই কমে যাবে। তবে টেকসই রফতানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারকে নীতিসহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও দূর করতে হবে।
রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনা অত্যন্ত জরুরি। পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে রফতানি সীমাবদ্ধ রাখা আয়ের জন্য সুফলদায়ক নয়। নতুন পণ্য ও নতুন গন্তব্যে মনোযোগ দিলে রফতানি আয় বাড়বে এবং দেশীয় শিল্পও বিকাশ পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাবে তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা থাকলেও বৈচিত্র্যময় পণ্য রফতানি তা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।
রফতানি বহুমুখীকরণ একক বা বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং শিল্পনীতি, আমদানিনীতি, আর্থিক নীতি ও অন্যান্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে। নীতিসহায়তা ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

