ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই গম, ভুট্টা, সয়াবিন, তুলা সহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়েছে। এলএনজি, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশসহ আরও কিছু পণ্যের আমদানি চুক্তি করেছে সরকার।
তবে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের চেয়ে আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৮১৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। তুলনায় ২০২৪ সালে এই ঘাটতি ছিল ৬০৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। ২০২৩ সালে ঘাটতি ছিল ৬০২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেবল পণ্য আমদানিই যথেষ্ট নয়। এসব পণ্য যেন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য হিসেবে হিসাব হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি যুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানিতে চুক্তি হয়েছে সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানির সঙ্গে। সরকার নিশ্চিত করবে, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যও বাংলাদেশের বাণিজ্য হিসেবে গণনা হবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান পঞ্জিকাবর্ষ (ক্যালেন্ডার ইয়ার) ভিত্তিক। আমরা আমাদের হিসাব অর্থবছর (ফাইন্যান্সিয়াল ইয়ার) অনুযায়ী করি। আমাদের বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, আমরা বাণিজ্য আলোচনায় যুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘাটতি কমছে। আমরা ঘাটতি কমিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে চাই। প্রেফারেন্সিয়াল মার্কেট অ্যাকসেস পেলে আমাদের বাণিজ্য আরও বাড়বে। এতে উভয় দেশই লাভবান হবে।”
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। শুরুতে শুল্ক ছিল ৩৭ শতাংশ। শুল্ক হ্রাসের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমদানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরওয়ারি প্রতিযোগিতামূলক দামে সাত লাখ টন গম আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়। পাঁচ বছরে মোট ৩৫ লাখ টন গম আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর প্রায় দুই লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। একই সময়ে তুলা, ভুট্টা, সয়াবিনসহ অন্যান্য পণ্যও আমদানি করা হয়েছে।
তবে সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে রফতানি বাড়েনি সমান হারে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমার বদলে বেড়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ঘাটতি বাড়লেও তা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে না। যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমছে, আমদানি বাড়বে। সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে চুক্তি করেছে, পণ্য এখনো দেশে পৌঁছায়নি। পোশাক রফতানিকারকরা তুলা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঘাটতি কমবে। তবে দৃশ্যমান হওয়ার জন্য পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগবে।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের বড় অংশ দখল করে এলএনজি, এলপিজি, রড, ক্লিংকার, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, সার, চিনি, তুলা, গম, পাম তেল, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল। এসব পণ্যের প্রধান উৎস হলো চীন।
চীন থেকে শিল্প-কারখানার যন্ত্র, কেমিক্যাল, বস্ত্র খাতের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স ও আসবাবপত্র আমদানি করা হয়। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। ভারতের সঙ্গে খাদ্যশস্য, মসলা, তুলা, মোটরযান, চিনিজাতীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানি হয়েছে বেশি। ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল, মসলা ও টায়ার আমদানি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইস্পাতের কাঁচামাল, খনিজ জ্বালানি, তেলবীজ, তুলা ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য আমদানির পাশাপাশি গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো খাদ্যপণ্যও এসেছে। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিপিডি-এর ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কম। শুল্ক বাড়লেও গত বছর আমাদের পোশাক রফতানি বেড়েছে। তবে ইউরোপে রফতানি কমেছে। আমদানি বাড়ানো হলেও ঘাটতি রাতারাতি কমবে না। আশা করি, সরকার ও উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতা শক্তি বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেবে। এতে উভয় দেশই উপকৃত হবে।”

