দেশে আমন, বোরো ও আউশ—তিন মৌসুমেই ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামেও রয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সন্তোষজনক খাদ্যশস্যের মজুত। তবুও চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মূল লক্ষ্য সরু চালের অস্বাভাবিক দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখা।এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারিভাবে ২ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
কেন আমদানির সিদ্ধান্ত
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজারে মাঝারি ও মোটা চালের দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও সরু চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দুটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ১৮ জানুয়ারি ২৩২টি প্রতিষ্ঠানকে চাল আমদানির অনুমতি দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকগুলোতেও ভারত অথবা থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানির প্রস্তাব নিয়মিতভাবে অনুমোদন পাচ্ছে।
আমদানির শর্ত
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শর্ত অনুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া আমদানিকারকদের আগামী ১০ মার্চের মধ্যে চাল আমদানি করে বাজারে ছাড়তে হবে। আমদানিকৃত চালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভাঙা দানা থাকতে পারবে। একই সঙ্গে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কারও নামে এই চাল পুনরায় প্যাকেটজাত করা যাবে না।
উৎপাদনের বাস্তব চিত্র
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ওই বছর বোরো উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টন, আমন ১ কোটি ৬৫ লাখ টন এবং আউশ ২৮ লাখ টন।
একই সময়ে দেশে গম উৎপাদিত হয়েছে ১০ লাখ টন এবং ভুট্টা ৭৪ লাখ টন। আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে গম ছিল ১১ লাখ টন ও ভুট্টা ৬৭ লাখ টন। ফলে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মোট দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩ লাখ টন। আগের বছর যা ছিল ৪ কোটি ৮৭ লাখ টন।
চলতি মৌসুমের অবস্থা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৮১ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫৩ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।
প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩ দশমিক ১১ টন হিসাবে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। অবশিষ্ট জমিতেও একই হারে ফলন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, বোরো ও আউশের উৎপাদনও গত বছরের তুলনায় কমবে না।
সরকারি মজুতের চিত্র
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারের কাছে ১৪ লাখ ৪৯ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। খাদ্য অধিদফতর বলছে, সরকারি গুদামে মোট মজুত প্রায় ২১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১৯ লাখ টন এবং গম ২ লাখ ৩ হাজার মেট্রিক টন।
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মত
রাজধানীর বাদামতলী–বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নিজাম উদ্দিন বলেন, বাজারে চালের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তার মতে, উৎপাদন পর্যাপ্ত হওয়ায় দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণও নেই। তিনি বলেন, মোকাম ও আড়ত পর্যায়ের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই বাজার অস্থির হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের চাল ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, বিভিন্ন অজুহাতে নাটোর, নওগাঁ ও জয়পুরহাটের মোকাম থেকে রাজধানীতে চাল আসছে না। এতে মাঝেমধ্যে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগই নিচ্ছে অসাধু চক্র।
কৃষি অর্থনীতিবিদ মোবারক হোসেন বলেন, বৈশ্বিক আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বিশ্বজুড়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ভালো। গম, ভুট্টা ও মসলাজাতীয় ফসলের দামও কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, দেশের খাদ্য মজুত এখন অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমান মজুতই সবচেয়ে বেশি। তার ভাষ্য, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরু চালের দাম বাড়তে থাকলে এর প্রভাব মাঝারি ও মোটা চালের বাজারেও পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে পুরো বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

