বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত ক্রমেই কিছু নির্দিষ্ট বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ১১টি দেশে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পোশাক রফতানি কেন্দ্রীভূত। এদের মধ্যে বছরে বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি হয়েছে। এই সাফলতা সত্ত্বেও খাত বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এটি রফতানির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট রফতানি আয় হয়েছে ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১১টি দেশে রফতানি হয়েছে ৩১.০৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির ৭৯.৯২ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই নির্ভর করছে এই সীমিত বাজারের ওপর।
প্রধান বাজারে রফতানি:
২০২৫ সালে যেসব দেশে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, সেগুলো হলো: যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, পোল্যান্ড, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় বাজার। এক বছরে রফতানি হয়েছে ৭.৫৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর জার্মানি ৪.৬৭, যুক্তরাজ্য ৪.৩৯, স্পেন ৩.৫০ এবং নেদারল্যান্ডস ২.১০ বিলিয়ন ডলার। বাকি দেশগুলোতে রফতানি ১–২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হয়েছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্ভরতা:
এই ১১ দেশের মধ্যে ১০টি ঐতিহ্যবাহী বাজার, শুধুমাত্র জাপান নন-ট্র্যাডিশনাল। যুক্তরাষ্ট্র একাই মোট রফতানির ১৯.৪৩ শতাংশ দখল করেছে। জার্মানি ও যুক্তরাজ্য মিলে আরও প্রায় ২৩ শতাংশ। ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর রফতানি নির্ভরতা খুব বেশি।
তবে ইইউতে রফতানি কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫) রফতানি ৪.১৪ শতাংশ কমে ৯.৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নিটওয়্যার পণ্যের রফতানি ৫.৫৪ শতাংশ কমে ৫.৭৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ওভেন পণ্যের রফতানি ১.৮৭ শতাংশ কমে ৩.৭০ বিলিয়ন ডলার।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতির কারণে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান দ্রুত শক্ত করছে। এতে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি, বছরশেষে গতি কম:
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ১৫ শতাংশ বেড়েছে। মূলত আগাম চালানের কারণে রফতানি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখাচ্ছে। তবে আগস্টের পর থেকে গতি কমতে শুরু করেছে। উচ্চ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর অক্টোবর-নভেম্বরে চালান দুর্বল হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বেড়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও ডেনমার্কে কমেছে। বিশেষ করে ডেনমার্কে প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সুযোগ:
নিট ও ওভেন—উভয় ধরনের পোশাকের প্রধান বাজার এই ১১ দেশ। কিন্তু এত সীমিত বাজারে নির্ভরতা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কোনো এক বাজারে মন্দা বা শুল্ক বৃদ্ধি হলে পুরো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বিলিয়ন ডলারের বাজার থাকাটা ইতিবাচক। কিন্তু প্রায় ৮০ শতাংশ রফতানি মাত্র ১১ দেশে সীমাবদ্ধ। নতুন নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারে কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।”
বিশ্ববাজারে মূল্যচাপ, ক্রেতাদের টেকসই উৎপাদন চাহিদা এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্ক সুবিধা হারার ঝুঁকি মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাত সংবেদনশীল সময়ে আছে। বাজার বহুমুখীকরণ ছাড়া টেকসই রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।

