ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি পোশাক বাজারে গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়কালে ইইউ’র মোট পোশাক আমদানি বাজার ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এই সময় প্রবৃদ্ধির হারে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
২০২১ সালে বিশ্ব থেকে ইইউ’র পোশাক আমদানি ছিল ৭২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ বিলিয়ন ইউরোতে। যদিও ২০২২ সালের রেকর্ড উচ্চতার পর ২০২৩ সালে বাজারে ধাক্কা লাগে, তবুও সামগ্রিক পাঁচ বছরে বাজারের বিস্তার উল্লেখযোগ্য। এই বিস্তৃত বাজারে নিজেদের অংশ আরও বাড়াতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।
২০২১ সালে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল ১৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ইউরোতে—অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।
একই সময়ে—
-
চীনের রফতানি বেড়েছে ২১ দশমিক ৪৮ শতাংশ (২১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন থেকে ২৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো)
-
ভারতের প্রবৃদ্ধি ৩৩ দশমিক ১৮ শতাংশ
-
তুরস্কের রফতানি কমেছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ
প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ কার্যত প্রধান প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে গেছে। বাজার সম্প্রসারণের পুরো সময়জুড়ে ধারাবাহিকভাবে অংশীদারত্ব বাড়াতে পারা নেতৃত্বের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে ইইউ’র মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ১০ শতাংশ। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা আস্থার ঘাটতি এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্থরতা এই ধীরগতির পেছনে প্রধান কারণ।
তবে এই সীমিত প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যেখানে—
-
চীনের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১৭ শতাংশ
-
তুরস্কের রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ
অর্থাৎ বাজারের গতি কমলেও প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে আরও শক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধ ছিল বিশেষভাবে কঠিন। বছর শেষে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও বছরের শেষভাগে রফতানি ঋণাত্মক ধারায় চলে যায়। একইভাবে ইউরোপ ও চীনও নেতিবাচক প্রবণতায় ছিল, তবে বাংলাদেশের পতন তুলনামূলকভাবে বেশি তীব্র ছিল।
ইউরোপীয় বাজারে ব্যাপক মূল্যচাপ তৈরি হয়। খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহকারীদের ওপর বড় ধরনের মূল্যছাড়ের চাপ সৃষ্টি করে। ফলে গড় রফতানি মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
তবুও বাংলাদেশ ভলিউম বাড়াতে সক্ষম হয়। কম দামে বেশি পণ্য সরবরাহের কৌশলে ইউরোপীয় ক্রেতারা ঝুঁকলে, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে।
চীন উচ্চ দক্ষতা ও স্কেলের সুবিধায় মূল্যছাড়ে সক্ষম হলেও সামগ্রিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বেড়েছে। ভিয়েতনাম ও তুরস্ক তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির দৌড়ে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া পাঁচ বছরে ৮৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানও সাম্প্রতিক বছরে ভালো করেছে।
তবে বড় আকারের বাজার দখলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী এবং প্রবৃদ্ধির ধারায় কার্যত নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে। বাজার সম্প্রসারণের পুরো সময়জুড়ে অংশীদারত্ব বাড়াতে পারা বাংলাদেশের কৌশলগত শক্তির প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ বাজারে প্রবৃদ্ধির এই ধারা ধরে রাখতে হলে শুধু ভলিউম নয়, ভ্যালু অ্যাডিশন, পণ্যের বৈচিত্র্য, টেকসই উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের সেগমেন্টে প্রবেশ অপরিহার্য।
কারণ বর্তমান বাজারে ‘ভলিউম গ্রোথ’-এর পাশাপাশি ‘ভ্যালু প্রেশার’ও রয়েছে। অর্ডার থাকলেও দাম কম। ফলে কম দামে বেশি পণ্য সরবরাহের মডেল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,
“দীর্ঘমেয়াদে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অগ্রগতি স্পষ্ট হলেও সাম্প্রতিক দুই বছরের ধীর প্রবৃদ্ধি সতর্কবার্তা দিচ্ছে। মোট বাজার সম্প্রসারিত হলেও চাহিদা আগের মতো শক্তিশালী নয়। তাই শুধুমাত্র ভলিউমের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের মান, ডিজাইন ও ভ্যালু অ্যাডিশনের দিকে নজর দিতে হবে।”
পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে ইইউ বাজারে প্রবৃদ্ধির দৌড়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি হারে রফতানি বৃদ্ধি, বাজার অংশীদারত্ব শক্তিশালী করা এবং মূল্যচাপের মধ্যেও ভলিউম ধরে রাখা—এই তিনটি সূচকই নেতৃত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক মন্থরতা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—এখন সময় গুণগত রূপান্তরের। নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে পরবর্তী ধাপে কৌশলগত পরিবর্তন অপরিহার্য।

