বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ডলারের চাপ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশ ধীরে ধীরে ‘এনার্জি ট্র্যাপ’ বা জ্বালানি ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। আজ শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব বিষয় উঠে আসে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, চাহিদা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং তথ্য সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের শুরুতে কিছু ব্যবস্থাপনা ত্রুটি দ্রুতই বাজারে আতঙ্ক তৈরি করে। এর ফলে হঠাৎ করে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যায়। পরে রেশনিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তা পুরো পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলো আরও প্রকট হচ্ছে। তিনি জানান, দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা এখনও সীমিত। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম বাড়ানো বা কমানো ভবিষ্যতেও চলবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। পর্যাপ্ত মজুত সুবিধা না থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশ এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
কৃষিখাতে জ্বালানির বাড়তি চাহিদার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল বলেন, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার কারণে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত ইঞ্জিন কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী দিনে কৃষি আরও যন্ত্রনির্ভর হলে জ্বালানির চাহিদাও বাড়বে।
আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম পাঁচ ডলার বাড়লেই দেশের অতিরিক্ত ব্যয় কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে।
তিনি মনে করেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না থেকে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎস থেকে জোগান বাড়ানোর উদ্যোগও জরুরি।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতি গ্রহণ ছাড়া এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।
তিনি পরামর্শ দেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিদ্যমান বেইজ প্ল্যান্টগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো দরকার। পাশাপাশি আমদানি করা বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে শিল্প ও সার উৎপাদন খাতে।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, টেকসই সমাধানের জন্য সৌর ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানোর ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানির অসম সরবরাহ এবং অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে।
ওয়েবিনারের শেষ পর্যায়ে অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার বড় ঘাটতি রয়েছে। কার্যকর সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করলে জ্বালানি সংকট ভবিষ্যতেও বারবার ফিরে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সংকটকালে সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।

