মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত বেশিরভাগ পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে। শুক্রবার দেওয়া এ রায়ের পর ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রভাব বোঝার আগে বাংলাদেশকে সময় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা উচিত।
গতকাল ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ পরামর্শ দেন। তাদের মতে, আদালতের রায় আইনগতভাবে স্পষ্ট হলেও বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিও আইনি ভিত্তি হারাতে পারে। তার ভাষ্য, যদি ট্যারিফই অবৈধ হয়, তবে সেই ভিত্তিতে করা চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) আইনের আওতায় এসব শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে আদালত বলেছে, এ আইন প্রেসিডেন্টকে সীমাহীনভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। পরিধি, মাত্রা ও মেয়াদ—সব ক্ষেত্রেই এর সীমা রয়েছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, আইনি ব্যাখ্যায় অস্পষ্টতা কম। কিন্তু বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তার মতে, প্রশাসনের হাতে অন্য আইনি বিকল্পও রয়েছে। তবে সেগুলোর ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সম্পৃক্ততা বা বাণিজ্য দপ্তরের তদন্ত প্রয়োজন হতে পারে। এতে বিলম্ব ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
এ ছাড়া আগে আদায় করা শুল্ক ফেরত দেওয়া হবে কি না, সেটিও এখনো অনিশ্চিত। আবদুর রাজ্জাক বলেন, চুক্তি সই মানেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর নয়। পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার হলেও দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতির আলাদা প্রভাব থাকতে পারে। তাই বাংলাদেশের কিছুটা সময় নেওয়া উচিত।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দুই দেশের কেউই এখনো চুক্তিটি র্যাটিফাই করেনি। ফলে এটি কার্যকর হয়নি। ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, রায়টি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। তার মতে, ট্যারিফ বাতিল হলে বাংলাদেশ চুক্তি অনুমোদন থেকে বিরত থাকার সুযোগ পাবে।
আদালতের এই মামলা ছিল প্রায় সব দেশের আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ককে ঘিরে। শুরুতে মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে গত এপ্রিলে এর পরিধি বাড়িয়ে আরও ডজনখানেক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর তা প্রয়োগ করা হয়।
হোয়াইট হাউস দাবি করেছিল, জরুরি অবস্থায় বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেয় আইইইপিএ। কিন্তু সমালোচকরা বলেন, আইনে ‘ট্যারিফ’ শব্দটির উল্লেখ নেই। কংগ্রেস কর আরোপের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগকে সীমাহীনভাবে দিতে চায়নি। এমনকি বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়নি।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের পক্ষে অবস্থান নেন। তিন উদারপন্থি বিচারপতির সঙ্গে ট্রাম্পের মনোনীত দুই বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট ও নিল গোরসাচ রায়ে সম্মতি দেন। ভিন্নমত দেন ক্ল্যারেন্স টমাস, ব্রেট কাভানাফ ও স্যামুয়েল আলিটো।
আদালত তাদের সিদ্ধান্তে জানায়, নির্বাহী বিভাগের ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ’ সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন থাকতে হবে। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কিছু নির্বাহী পদক্ষেপেও একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে শুল্ককে অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ে। এতে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পূর্বাভাস ছিল, এসব শুল্ক আগামী এক দশকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আনতে পারে। তবে ১৪ ডিসেম্বরের পর শুল্ক আদায়ের তথ্য প্রকাশ করেনি ট্রাম্প প্রশাসন। গতকাল পেন-ওয়ার্টন বাজেট মডেলের অর্থনীতিবিদরা হিসাব করে জানান, আইইইপিএ ভিত্তিক শুল্ক থেকে আদায় হয়েছে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আদালতের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আদালতের নির্দিষ্ট কয়েকজন সদস্য দেশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দেখাতে পারেননি। তার ভাষ্য, এই সিদ্ধান্তে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো উচ্ছ্বসিত হলেও তারা বেশিদিন সুবিধা পাবে না।
কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, পাল্টা শুল্কের বদলে নতুন করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপে নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, ওভাল অফিসে বসেই এ আদেশে সই করা হয়েছে এবং এটি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা দেশগুলোর ওপরও নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে। তারা নিজ নিজ চুক্তির শুল্ক হারের বদলে সেকশন ১২২-এর অধীনে এই হার দেবে। এ তালিকায় যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে। তবে তালিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশের উচিত আইনি ও কূটনৈতিক দিক পর্যালোচনা করা।

