যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপের পর একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ওই পাল্টা শুল্ককে বেআইনি ঘোষণা করায় এখন চুক্তিটির আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ও দায় কতটা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখতে নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ কী দিচ্ছে এবং কী পাচ্ছে, তা পুনরায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, দেশের স্বার্থ সুরক্ষায় চুক্তিটি সমন্বয় করা জরুরি। এতে করে বাংলাদেশ যেন প্রকৃত সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা দেওয়া হলে, তার বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্য সমমানের সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। তা না হলে চুক্তিটি অসম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল। এর আগে মার্কিন বাজারে স্বাভাবিক শুল্কহার ছিল ১৫ থেকে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে মোট শুল্কহার দাঁড়াত প্রায় ৩৪ শতাংশ। কিন্তু গত শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ওই পাল্টা শুল্ককে বেআইনি ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যে আইনের আওতায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর এই শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেই আইন তাঁকে এমন ক্ষমতা দেয় না।
এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কৌশল নেন। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একই দিনে তিনি ভিন্ন আইনের অধীনে বিভিন্ন দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এই শুল্ককে বলা হচ্ছে ‘সাময়িক আমদানি সারচার্জ’। পরদিন শনিবার রাতে তিনি জানান, এই হার আরও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হবে। নতুন এই শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং সর্বোচ্চ ১৫০ দিন বলবৎ থাকবে।
পাল্টা শুল্কের পরিবর্তে ট্রাম্প যে নতুন ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করছেন, তা সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এর ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কহার দাঁড়াবে ৩০ থেকে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তা এখনো বাধ্যতামূলক নয়। কারণ, চুক্তিটি এখনো কোনো পক্ষ অনুস্বাক্ষর করেনি এবং কার্যকর হয়নি। ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ক বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশ চাইলে এই চুক্তি অনুস্বাক্ষর না-ও করতে পারে। প্রয়োজনে দর-কষাকষির সুযোগও নিতে পারবে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আইনি ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এই রায়ের ফলে চুক্তিটি কার্যত অবৈধ হয়ে যাবে এবং এটি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
এ অবস্থায় চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, আগে ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে শুল্ক কমানোর মাধ্যমে কিছু সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আদালতের রায়ে সেই কাঠামো বাতিল হয়ে যাওয়ায় এখন তা আর কার্যকর নেই।
চুক্তির বৈধতা নিয়ে একমত হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে রায়টি স্পষ্ট। তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, তার ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারের এখন সতর্কভাবে এগোনো উচিত। তাঁর মতে, যেসব শর্তে এই চুক্তি করা হয়েছিল, তা নিয়ে এখনই আলোচনায় গেলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এমনকি বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমানোর সিদ্ধান্তও আসতে পারে। তাই এ মুহূর্তে কিছুটা সময় নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

