বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজার যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে পোশাক আমদানিতে সামগ্রিকভাবে মন্দা বিরাজ করলেও বাংলাদেশ সেখানে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, চাহিদা হ্রাস ও শুল্কসংক্রান্ত উদ্বেগের মধ্যেও এই সাফল্য প্রমাণ করেছে—মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আগের চেয়ে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৭.৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ১.৭৪ শতাংশ কম।
পরিমাণের হিসাবে (স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট বা এসএমই) আমদানি কমেছে ৩.৭০ শতাংশ। তবে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ২.০৩ শতাংশ, যা ইঙ্গিত দেয়—চাহিদা কমলেও মূল্যচাপ পুরোপুরি কমেনি।
সামগ্রিক বাজারে মন্দা থাকলেও ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২০ বিলিয়ন ডলারে। এটি এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক রেকর্ড।
২০২৪ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি ১১.৭১ শতাংশ।
শুধু ডিসেম্বর ২০২৫ মাসেই বাংলাদেশ থেকে আমদানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩.৩৩ শতাংশ বেড়েছে—যা বছরের শেষভাগের দুর্বল বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ দাঁড়িয়েছে ১০.৫৩ শতাংশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আমেরিকান ক্রেতাদের জন্য অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।
অন্যান্য প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে—
-
ভিয়েতনাম: ২১.৫০ শতাংশ
-
চীন: ১৩.৬৬ শতাংশ
-
ভারত: ৬.৩৫ শতাংশ
-
কম্বোডিয়া: ৬.২০ শতাংশ
-
ইন্দোনেশিয়া: ৫.৯৮ শতাংশ
বিশেষ করে লক্ষণীয়, চীন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে ধীরে ধীরে অবস্থান হারাচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম মূল্য প্রবৃদ্ধি, ইউনিট মূল্য ও পরিমাণগত পারফরম্যান্সে প্রায় একই ধারা দেখিয়েছে। তবে ভিয়েতনাম এখনো বড় অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের তুলনায় দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন পোশাক বাজারের প্রবৃদ্ধি ছিল দুর্বল। বছরের শেষ তিন মাসে পারস্পরিক শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং ভোক্তাদের কম চাহিদার কারণে আমদানি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই শক্তিশালী রপ্তানি পারফরম্যান্স বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ চেইনে দেশটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং ক্রমবর্ধমান কমপ্লায়েন্স মানের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “পারস্পরিক শুল্ক এবং সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের অনিশ্চিত পরিবেশেও বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে ভালো করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “চীন স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে অবস্থান হারাচ্ছে, আর বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম মূল্য, ইউনিট মূল্য এবং পরিমাণ বৃদ্ধিতে একই ধারা দেখাচ্ছে, যদিও ভিয়েতনাম এখনও অনেক বড় অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে।”
রুবেলের মতে, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ক্রেতাদের আস্থা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতারই প্রতিফলন।
বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। শুল্কনীতি, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ভোক্তা চাহিদার ওঠানামা—সব মিলিয়ে আগামী বছরগুলোও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
তবে ২০২৫ সালের পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিয়েছে—প্রতিকূল বাজারেও বাংলাদেশ তার শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম। এখন লক্ষ্য হবে এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করা এবং বাজার অংশীদারিত্ব আরও বাড়ানো।

