বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। অথচ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থে চলা জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড পেয়েছে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক সরকারি জলবায়ু অর্থের বড় অংশও আসছে ঋণ হিসেবে। ফলে প্রয়োজন ও প্রাপ্তির মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবধান মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট। সিরাজগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার একটি বস্তিতে দুই বছর আগে স্থানীয় একটি এনজিওর উদ্যোগে জলবায়ু তহবিলের অর্থে সৌরবিদ্যুৎচালিত পানির পাম্প বসানো হয়েছে। এতে বস্তির মানুষের পানির কষ্ট কিছুটা কমেছে। রাহেলা খাতুন নামের এক বাসিন্দা জানান, আগে পৌরসভার লাইনের পানির জন্য সারি দিতে হতো এবং কখন পানি আসবে, তার নিশ্চয়তা ছিল না। এখন যখন দরকার, তখনই পানি পাওয়া যায়। কিন্তু স্থানীয় লোকজন ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের হিসাবে, শহরে প্রায় ৩০টি বস্তি থাকলেও আর কোথাও এমন ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ একটি ছোট প্রকল্প মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, আবার বাকি বস্তিগুলো দেখলে বোঝা যায় প্রয়োজনের তুলনায় অর্থ কত সীমিত।

সাতক্ষীরার আশাশুনির প্রান্তিক নারী মিতা রানী দাশের অভিজ্ঞতাও একই চিত্র তুলে ধরে। বিধবা এই নারীর সংসার চলে ছোট একটি মাছের ঘের থেকে। গত বছর প্রচণ্ড গরমে ঘেরের প্রায় ৩০ শতাংশ মাছ মরে যায়। পরে জুলাইয়ের প্রবল বৃষ্টিতে ঘের উপচে বাকি মাছের বেশির ভাগ নষ্ট হয়। তাঁর কাছে আগাম আবহাওয়ার কোনো সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহ এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। এসব মানুষের জীবিকা, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রতিদিন ঝুঁকিতে ফেলছে। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) ২০২৩-২০৫০ অনুযায়ী, ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি ডলার দরকার। বছরে গড়ে প্রয়োজন ৮৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক তহবিল ও উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে। পরিকল্পনায় ছয়টি অভিযোজন লক্ষ্য ও ২৩টি কৌশলের অধীনে পানি, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, নগর, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ আটটি অগ্রাধিকার খাত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ হিসাবটি শুধু বাঁধ বা বড় অবকাঠামোর নয়। স্থানীয় আগাম সতর্কবার্তা, জলবায়ুসহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও নগরে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের ব্যবস্থাও এর অংশ।
এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন ১১ হাজার ৬১৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯৫ কোটি ডলার দেশীয়ভাবে জোগাড় করার কথা। বাকি ৯ হাজার ২৩ কোটি ডলার নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তার ওপর। তবে ন্যাপ ও এনডিসির অঙ্ক সরাসরি যোগ করা যাবে না। ন্যাপ দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের হিসাব, আর এনডিসির অঙ্ক নিঃসরণ কমানোর কার্যক্রমের জন্য। দুই নথির সময়সীমা ও খাতও আলাদা। তবে দুটিই দেখায়, জলবায়ু পরিকল্পনার আর্থিক চাহিদা দেশীয় বাজেটের সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি।
জলবায়ু অর্থায়নের আলোচনায় তিন ধরনের কাজ আলাদা রাখা জরুরি। প্রশমন মানে নিঃসরণ কমানো, যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি। অভিযোজন মানে ইতিমধ্যে দেখা দেওয়া বা আসন্ন ঝুঁকির সঙ্গে মানুষ ও অর্থনীতিকে খাপ খাওয়ানো। আর ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়ন দরকার হয় তখন, যখন অভিযোজন করেও ক্ষতি ঠেকানো যায় না, যেমন নদীতে জমি বিলীন হওয়া বা ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদ হারানো। এক খাতের অগ্রগতি দিয়ে অন্য খাতের ঘাটতি ঢাকলে প্রকৃত প্রয়োজন বোঝা যায় না। অস্বাভাবিক বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ বা নদীভাঙনকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলাও ঠিক নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূমি ব্যবহার ও দুর্বল অবকাঠামোও ক্ষতি বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তন এসব পুরোনো সমস্যার তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি বাড়ায়।
অর্থ বিভাগের জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ২৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সম্মিলিত বরাদ্দের হিসাবে হারটি ১১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। বাজেটে বন সৃজন, বায়ু ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্বন বাণিজ্য এবং এক শিশু এক গাছ কর্মসূচির মতো উদ্যোগের কথা আছে। জলবায়ু ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় সরকার, পানি, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে থাকে। তাই শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেখে মোট জলবায়ু ব্যয়ের ছবি পাওয়া যায় না।
ট্রাস্ট ফান্ডের ১০০ কোটি টাকার হিসাবটি আলাদা। এটি পুরো জলবায়ু বাজেট নয়, শুধু বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের বরাদ্দ। বড় প্রকল্পের বাইরে তুলনামূলক ছোট ও জরুরি উদ্যোগে সরকার এই তহবিল ব্যবহার করতে পারে। জাতীয় বাজেট আট গুণের বেশি বাড়লেও দেড় দশক আগে গঠিত এই তহবিলের বার্ষিক বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়েনি। পরিবেশ ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ বলেন, এবারের বাজেটে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা আছে। কিন্তু বড় লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তাঁর মতে, প্রয়োজনের তুলনায় ট্রাস্ট ফান্ডে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ হতাশাজনক।
সমস্যা শুধু বরাদ্দের অঙ্কে নয়, ব্যয়ের মানেও। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন প্রায় ৮৫ শতাংশে আটকে আছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাচ্ছে কি না এবং নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, কৃষক ও জেলেরা প্রকল্পের কেন্দ্রে আছেন কি না, তা দেখা দরকার। সড়ক, সেতু বা ড্রেনেজ প্রকল্পের নকশায় জলবায়ুঝুঁকি বিবেচনা না করলে শুধু নামের কারণে সেটি সহনশীল অবকাঠামো হয় না। বরাদ্দের সঙ্গে ফলের যোগসূত্রও প্রকাশ করা দরকার। একটি খাল খননে কত মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেলেন বা উপকূলে নিরাপদ পানির দূরত্ব কতটা কমল, এমন সূচক না থাকলে ব্যয়ের মান মাপা যায় না। প্রকল্প শেষে রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তাও শুরুতেই ঠিক করতে হবে।
আন্তর্জাতিক চিত্র আরও হতাশাজনক। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির অ্যাডাপ্টেশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজনে বছরে ৩১ হাজার থেকে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। অথচ ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থ ছিল মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২০০ কোটি ডলার কম। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির ব্যবধান ১২ থেকে ১৪ গুণ। ওইসিডির হিসাবে, উন্নত দেশগুলো ২০২৩ সালে ১৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার এবং ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার জলবায়ু অর্থ দিয়েছে বা সংগ্রহে সহায়তা করেছে। বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের যে লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে পূরণের কথা ছিল, তা প্রথম পূরণ হয় ২০২২ সালে, অর্থাৎ দুই বছর দেরিতে।
ক্লাইমেট পলিসি ইনিশিয়েটিভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রথমবার ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারই গেছে প্রশমনে। অভিযোজন অর্থ ২০২৩ সালে কমে ২০২৪ সালে প্রায় স্থির ছিল। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো স্পষ্ট বাজার থাকা খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও নিরাপদ পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগসহনশীল জীবিকার অর্থায়ন একই গতিতে বাড়ছে না। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর অর্থও বাড়ছে। ১০টি বড় ব্যাংকের যৌথ হিসাবে, ২০২৫ সালে তাদের নিজস্ব জলবায়ু অর্থায়ন প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর ১০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার গেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে, যার মধ্যে অভিযোজনে ছিল ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। তবে ওইসিডি, ইউএনইপি ও সিপিআইয়ের অঙ্ক সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। এসব সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করে। এই পার্থক্য না বুঝলে একই অর্থ একাধিকবার গণনার ঝুঁকি থাকে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো, সহায়তা অনুদান হবে নাকি ঋণ। ওইসিডির হিসাবে, ২০২৩ সালে উন্নত দেশগুলোর দেওয়া সরকারি জলবায়ু অর্থের ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৬৭ শতাংশ ছিল ঋণ। অনুদানের অংশ ছিল যথাক্রমে ২৪ ও ২৯ শতাংশ। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক দায় মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোর, তাই কম নিঃসরণকারী দেশের ক্ষতি সামলাতে নতুন ঋণের বোঝা চাপানো ন্যায্য নয়। অবশ্য সব ঋণের শর্ত এক নয়। কোনোটি বাজারদরে, কোনোটি কম সুদে ও দীর্ঘ মেয়াদে। তাই সুদ, মেয়াদ, মুদ্রা এবং প্রকল্প থেকে আয় হবে কি না, সবই বিবেচ্য।
সমস্যা হলো, অভিযোজনের বহু প্রকল্প সরাসরি রাজস্ব তৈরি করে না। বাঁধ, খাল পুনঃখনন, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, আগাম সতর্কবার্তা বা দরিদ্র মানুষের নিরাপদ বাসস্থানের সামাজিক লাভ বড় হলেও বাণিজ্যিক আয় সীমিত। এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি বাজেটেই পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ঋণে টাকার অবমূল্যায়ন সেই ব্যয় আরও বাড়াতে পারে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে ব্যয় কমায়, এমন প্রকল্প সহজ শর্তের ঋণ শোধ করতে পারে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে ঘর হারানো পরিবারের পুনর্বাসন বা লবণাক্ত এলাকায় সুপেয় পানির প্রকল্প থেকে রাজস্ব আসার সুযোগ কম। এসব কাজে অনুদান বা অত্যন্ত সহজ শর্তের দীর্ঘমেয়াদি অর্থ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। নইলে জলবায়ু ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশের করদাতাকেই বহন করতে হয়।
বৈশ্বিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ১০টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, যেখান থেকে জিসিএফের ৯৭ লাখ ডলার পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অনুমোদিত অর্থের খুব সামান্যই হাতে এসেছে। প্রকল্প প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অনুমোদিত সহায়তা আরও ৬১ লাখ ডলার। এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বছরে ৮৫০ কোটি ডলারের চাহিদার তুলনায় সামান্য। অনুমোদন, চুক্তি, অর্থছাড় ও মাঠপর্যায়ে ব্যয়, এ চারটি আলাদা ধাপ।
কোন ধাপে কত অর্থ আছে, তার সহজ ও হালনাগাদ সরকারি হিসাব প্রকাশিত না হলে প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা কঠিন। জিসিএফের অর্থ পেতে জটিল প্রস্তাব, কারিগরি সক্ষমতা, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘ জবাবদিহি প্রক্রিয়া পেরোতে হয়। তাই কোন এলাকার কোন ঝুঁকিতে কত বিনিয়োগ দরকার, প্রকল্পের সম্ভাব্য ফল কী এবং অর্থ শেষ হলে কাজ কীভাবে চলবে, এসব তথ্যসহ প্রস্তুত প্রকল্পের তালিকা থাকতে হবে।
ব্র্যাক ও জার্মান সরকারের কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ২০১৯ সালে ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড গঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত বা ঝুঁকিতে থাকা শহরের মানুষকে সহায়তা দিতে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাকে অনুদান দেয় এই তহবিল। ওইসিডির ২০২৫ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, এর প্রাথমিক মূলধন ছিল প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলার। সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে বছরে প্রায় ২০ লাখ ডলার আয় হচ্ছে, যা স্থানীয় অভিযোজন প্রকল্পে অনুদান হিসেবে যায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬টি প্রকল্পে অনুদান গেছে। আবেদন থেকে প্রথম অর্থছাড় হতে গড়ে ছয় মাসের কম সময় লেগেছে। এসব প্রকল্পে ১৫ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার সহায়তা পেয়েছে। এক লাখের বেশি মানুষের জন্য পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অবকাঠামো হয়েছে এবং বস্তির ২৭ হাজার বাসিন্দা বন্যাসহনশীল হাঁটার পথ ও ড্রেনেজে উপকৃত হয়েছেন। তবে এগুলো মূলত তহবিলটির নথিভুক্ত ফল। পরিবর্তনগুলো কতটা টেকসই, তা বুঝতে স্বাধীন ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন প্রয়োজন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক মো. গোলাম রব্বানী বলেন, নতুন উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানাতে হবে। তবে ছোট উদ্যোগ কিছু দূর যেতে পারে, বড় সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বৃহৎ অর্থায়নের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।
সমাধানের পথ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ, গ্রিন বন্ড, মিশ্র অর্থায়ন, দুর্যোগঝুঁকি বিমা, কার্বন বাজার ও স্থানীয় অভিযোজন তহবিলের মতো উৎস বাড়ানোর কথা উঠে এসেছে। তবে এগুলো অনুদানের বিকল্প নয়। অভিযোজন প্রকল্পে বাণিজ্যিক মুনাফা কম বলে সরকারি অর্থ ও আন্তর্জাতিক অনুদানকে অনুঘটক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে হবে। মিশ্র অর্থায়নে সরকারি বা অনুদানের অর্থ প্রথম ঝুঁকি নিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কমায়। বিমা দুর্যোগের পর দ্রুত নগদ সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু প্রিমিয়াম দরিদ্র মানুষের নাগালের বাইরে থাকলে ভর্তুকি লাগবে। কার্বন বাজার থেকে আয় সম্ভব, তবে নিঃসরণ কমানোর নির্ভরযোগ্য হিসাব, স্থানীয় মানুষের ভূমি ও সম্পদের অধিকার এবং আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত না হলে নতুন বিরোধ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় সরকারের ভূমিকাও বাড়াতে হবে। কোথায় পানি জমে, কোন বসতিতে পানির সংকট এবং কারা তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ঝুঁকিতে, এই তথ্য স্থানীয় পর্যায়েই সবচেয়ে স্পষ্ট। অথচ প্রকল্প তৈরি, দরপত্র, হিসাব ও আন্তর্জাতিক তহবিলের শর্ত পূরণে ছোট পৌরসভা ও স্থানীয় সংগঠনের সক্ষমতা কম। তাই শুধু অর্থ দিলেই হবে না। প্রকল্প তৈরির কারিগরি সহায়তা, সহজ আবেদনপদ্ধতি এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিবেশও অনিশ্চিত। ওইসিডির প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫ সালে উন্নয়ন সহায়তা কমিটির সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর সরকারি উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে, যা নথিভুক্ত ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন। জলবায়ু অর্থ ও উন্নয়ন সহায়তা এক নয়, তবে দাতা দেশগুলোর বাজেট সংকোচন জলবায়ু অনুদানের ওপরও চাপ বাড়াতে পারে। এ কারণে শুধু নতুন উৎস খোঁজা নয়, পাওয়া অর্থের অগ্রাধিকার ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অর্থ বিভাগ ও ইউএনডিপি এখন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কৌশল তৈরির কাজ করছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন সেলও রয়েছে। এখন দরকার এমন একটি পূর্ণাঙ্গ উন্মুক্ত ডেটাবেজ, যেখানে দেশীয় বরাদ্দ, বিদেশি প্রতিশ্রুতি, অনুমোদন, ঋণ-অনুদানের শর্ত, অর্থছাড়, ব্যয় ও ফলাফল এক জায়গায় দেখা যাবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে তিনটি বাস্তবতা। ঝুঁকি বাড়ছে, সরকারি অর্থ সীমিত, আর আন্তর্জাতিক অর্থ অনিশ্চিত ও শর্তসাপেক্ষ। এ অবস্থায় নিজস্ব বাজেটে ধারাবাহিক ও যথেষ্ট বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অনুদান ও সহজ শর্তের অর্থ বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি অর্থ পাওয়ার পথ তৈরি করা জরুরি। প্রতিটি প্রকল্পে জলবায়ুঝুঁকি ও ফল মাপতে হবে, আর ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে পরিকল্পনা ও তদারকিতে যুক্ত করতে হবে। তা না হলে বড় অঙ্ক নথিতেই থেকে যাবে, আর আমলাপাড়ার মতো বহু বস্তির মানুষ নিরাপদ পানির একটি পাম্পের অপেক্ষাতেই থাকবেন।

