বাংলাদেশে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা করছে বৈশ্বিক ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিওন। তাদের বাংলাদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলালিংকের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষকে সহজে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসা।
নতুন এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকেরা তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ এবং নিরাপদে সঞ্চয়ের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ভিওন বোর্ড প্রেস মিট’ অনুষ্ঠানে গতকাল মঙ্গলবার এসব পরিকল্পনার কথা জানান ভিওন ও বাংলালিংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ভিওনের বোর্ড সভা আয়োজন উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
রিকশাচালক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইওহান বুসে জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারকে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় আনাই হবে এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন রিকশাচালক দিনের শুরুতে রিকশা ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ক্ষুদ্রঋণ হিসেবে নিতে পারবেন এবং দিন শেষে তা পরিশোধ করতে পারবেন। একইভাবে একজন গৃহিণী অল্প পুঁজি নিয়ে নিজের ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য অর্থায়নের সুযোগ পাবেন।
তাঁর মতে, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও সহজে অনুসরণযোগ্য হবে। এতে লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ এবং আর্থিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি বাড়বে। পাশাপাশি সরকারের কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত উন্নয়নেও এ ধরনের উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে আরও ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা
ভিওন গ্রুপের চেয়ারম্যান অগি কে ফাবেলা জানান, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে আসছে তাঁদের প্রতিষ্ঠান। একটি ছোট আঞ্চলিক পরিচালন ব্যবস্থা থেকে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে আরও ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ভিওন। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে প্রচার ও যোগাযোগ কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই উদ্যোগের প্রথম আয়োজন করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে, প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে। সেখানে বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে রোডশো
অগি কে ফাবেলা জানান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত ১০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি স্পষ্ট করেন, এই বিনিয়োগ ভিওনের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসবে না। বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা যেন ভিওনের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে বাংলাদেশে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হন, সেটিই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
তাঁর দাবি, রোডশোতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়েও ভাবছে ভিওন
বাংলাদেশে ভিওনের কার্যক্রম ভবিষ্যতে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ভিওনের চেয়ারম্যান জানান, বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং তাঁদের বিনিয়োগের বিপরীতে যথাযথ মুনাফা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হওয়ার পরই তালিকাভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে ভিওনের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কান তেরজিওগ্লো, বোর্ডের অন্যান্য সদস্য এবং বাংলালিংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা, নতুন বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আকর্ষণের উদ্যোগ বাংলাদেশের আর্থিক ও টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, আর্থিক নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে উদ্যোগটির বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

