দেশে নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটকের আলোচনা উঠলেই প্রথমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ। বেআইনি গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, রিমান্ডে অপব্যবহার, হেফাজতে নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি—এসব অভিযোগই বারবার সামনে আসে।
রাজনৈতিক সংকট, গণগ্রেপ্তার বা হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই সমাধান হিসেবে সাধারণত পুলিশের সংস্কারের দাবি জোরালো হয়।
কিন্তু এই পুরো কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। পুলিশ একা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে না। তারা গ্রেপ্তার করে, আসামিকে আদালতে তোলে, রিমান্ড আবেদন করে এবং তদন্তের কাগজপত্র প্রস্তুত করে।
তবে একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে কেবল পুলিশের বক্তব্য কোনো পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে পারে না। এই জায়গাতেই আসে বিচার বিভাগের ভূমিকা—যা নাগরিকের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা।
বিচার বিভাগের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগকে যাচাই করা অর্থাৎ আদালতের কাছে মূল প্রশ্নগুলো হওয়া উচিত—গ্রেপ্তারটি আইনসম্মত ছিল কি না, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়েছে কি না, আটকের যথাযথ কারণ আছে কি না, রিমান্ড সত্যিই প্রয়োজনীয় কি না, কিংবা আসামির ওপর কোনো ধরনের চাপ বা নির্যাতন হয়েছে কি না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্তের নামে কাউকে যেন শাস্তির মতো পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা না হয়—তা নিশ্চিত করা।
তবে বাস্তবতা হলো, এই প্রশ্নগুলো কতটা গভীরভাবে আদালতে তোলা হয়, তা নিয়ে জনপরিসরে খুব কম আলোচনা হয়। পুলিশ বা সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা নিয়মিত হলেও বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে এক ধরনের অনীহা দেখা যায়। এই নীরবতা অনেক ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচারকে দুর্বল করে দেয়।
অনেক মামলায় দেখা যায়, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিকে হাজির করা একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। রিমান্ড আবেদন অনেক ক্ষেত্রে বিস্তারিত যাচাই ছাড়াই মঞ্জুর হয়। জামিন আবেদনও কখনো কখনো পর্যাপ্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ ছাড়া নাকচ হয়ে যায়।
বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলাগুলোতে অভিযোগের ভিত্তি ও যুক্তি গভীরভাবে যাচাই করা হয় কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ফলে পুলিশের উপস্থাপিত তথ্য অনেক সময় প্রায় সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়, আর আদালতের ভূমিকা হয়ে পড়ে সীমিত।
বিচার বিভাগের দায় কতটা?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—সব বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেট একইভাবে কাজ করেন না। বিচার ব্যবস্থার ভেতরে কাঠামোগত চাপ রয়েছে। আদালতগুলো অতিরিক্ত মামলার চাপ বহন করে, জনবল ও সম্পদের ঘাটতি রয়েছে, এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর নানা ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক চাপ কাজ করে।
তবুও মৌলিক নীতি পরিবর্তন হয় না। রাষ্ট্র যখন কোনো নাগরিকের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তখন আদালতের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালত কেবল তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং নাগরিকের অধিকার রক্ষার শেষ প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা বলয়।
রাজনৈতিক আন্দোলন, বিরোধী দলীয় কর্মসূচি, শ্রমিক অসন্তোষ কিংবা ছাত্র আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে যায়—এমন প্রবণতা দেখা যায়। এসব পরিস্থিতিতে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাও একটি দিক হয়ে ওঠে।
এই প্রক্রিয়ায় পুলিশ দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করে, তবে আদালতই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে সেই পদক্ষেপ বৈধ থাকবে কি না। আদালত যদি পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই রিমান্ড বা আটকের অনুমোদন দেয়, তাহলে তা শুধু তদন্তের অংশ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি বিচার শুরুর আগেই এক ধরনের শাস্তিতে রূপ নেয়।
রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে যদি যথাযথ ব্যাখ্যা না থাকে, তাহলে তা নাগরিক অধিকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। একইভাবে, জামিন যদি ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা ছাড়াই নাকচ করা হয়, তাহলে তা বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই শাস্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ যদি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিচারিকভাবে যাচাই না হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বচ্ছতার ঘাটতি ও আস্থার সংকট:
রিমান্ড, জামিন এবং বিচারপূর্ব আটক সংক্রান্ত তথ্য যদি নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে কোন ধরনের মামলায় কী ধরনের সিদ্ধান্ত হচ্ছে—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই স্বচ্ছতার অভাব শুধু তথ্যগত ঘাটতি তৈরি করে না, বরং বিচার ব্যবস্থার ওপর জনআস্থাকেও প্রভাবিত করে।
উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য আরও স্পষ্ট নির্দেশনা ও মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। গ্রেপ্তার, রিমান্ড, জামিন এবং হেফাজতে সুরক্ষার বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। বিশেষ করে Bangladesh Legal Aid and Services Trust (BLAST) বনাম বাংলাদেশ মামলায় দেওয়া নির্দেশনা এবং সাম্প্রতিক আইনি সংস্কার বাস্তবায়নকে কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবল নির্দেশনা থাকলেই হবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে বিচারিক ব্যবস্থা কেবল পুলিশের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ সাধারণত পুলিশি নির্যাতনের বিষয়ে সোচ্চার থাকে। তবে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়।
এর পেছনে একদিকে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানবোধ, অন্যদিকে আদালতের কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত থাকার বাস্তবতা। ফলে অনেক সময় সরাসরি সমালোচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বহু বছর ধরে পুলিশ সংস্কারের দাবি চললেও নির্বিচার আটক পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর একটি কারণ হলো, সমস্যা কেবল থানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আদালত পর্যন্ত বিস্তৃত।
পুলিশ যেখানে প্রক্রিয়া শুরু করে, আদালত সেখানে সেটিকে থামাতে পারে অথবা বৈধতা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনই একটি বিতর্কিত গ্রেপ্তারকে আইনগত কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসে।
তাই প্রশ্নটি কেবল পুলিশ কেন ক্ষমতার অপব্যবহার করছে—এতেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আদালত কেন সেই অপব্যবহার যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত নির্বিচার আটক নিয়ে বিতর্ক কেবল আলোচনার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে, বাস্তব পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

