বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সরকারি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশ ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও বাজেট বাস্তবতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
৯ মাসেই ছাড়িয়ে গেল বার্ষিক ঋণ লক্ষ্য:
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। বাজেট অনুযায়ী পুরো অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু জুলাই থেকে মার্চ—এই ৯ মাসেই সেই সীমা অতিক্রম করে ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। পরে কিছু অংশ পরিশোধ করা হলেও নিট ঋণ এখন প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি রয়েছে।
সরকার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ক্রমেই ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে ব্যাংকিং খাত থেকেই বড় অঙ্কের অর্থ নিতে হচ্ছে। নির্ধারিত মাসিক ঋণ সীমা অতিক্রম করে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করছে। এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে বেতন-ভাতা, ভর্তুকি এবং সুদ পরিশোধসহ জরুরি ব্যয় নির্বাহে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। এতে বাজেট ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তারা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের ঋণনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। তাদের মতে, বর্তমান প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে এবং নীতিগতভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে হবে।
ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে অর্থনীতিতে:
দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৪ সালের জুন শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২২ সালের জুনে এই অঙ্ক ছিল ১৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত গতিতে বেড়েছে, যা অর্থনীতিতে নতুন চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশের মোট সরকারি ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের ৩০ জুনে, সরকার পরিবর্তনের ঠিক আগে, মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকায়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকাশিত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ঋণ বুলেটিনে এই পরিমাণ দেখানো হয় ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। তবে বৈদেশিক ঋণ নতুন বিনিময় হারে পুনর্মূল্যায়নের কারণে অতিরিক্ত ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা যুক্ত হয়, ফলে মোট ঋণ আরও বেড়ে যায়।
সরকারের ঋণ কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণের কিস্তি গ্রহণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে সরকার বাজেট সহায়তা হিসেবে ৩৪৪ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ২০০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।
দেড় বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের সরকারের পতনের এক মাস আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়।
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বিপুল ঋণের চাপে পরিচালিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দাবি করেন, প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়েই বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে।
গত রবিবার (৩ মে) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চারদিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সময় বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তাঁর মতে, আড়াই মাসে কিছুটা অগ্রগতি হলেও তা এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বর্তমানে সরকারের ঋণ গ্রহণের কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশ আসছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে, যেখানে বৈদেশিক ঋণের অংশ ৪৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। তবে এই কৌশলের একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতিতে বাড়ছে ঋণনির্ভরতা:
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই ঋণ শুধু উন্নয়ন ব্যয় নয়, অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি স্বাভাবিক বাজেট ব্যবস্থাপনার বাইরে একটি চাপ তৈরি করছে।
ঋণের সবচেয়ে বড় চাপ এখন সুদ পরিশোধে দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই মোট বাজেট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে শুধুমাত্র ঋণের সুদ পরিশোধে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাজেটের বড় একটি অংশ এখন ঋণ পরিষেবায় ব্যয় হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণের চাপ কমেনি। এর প্রধান কারণ হলো পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ, পরিচালন ব্যয়ের উচ্চতা এবং রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। ফলে নতুন প্রকল্প কমলেও অতীতের দায় অর্থনীতিকে চাপে রাখছে।
সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন টাকা ছাপিয়ে তা সরবরাহ করা হয়। অর্থনীতিতে এটি ‘হাই-পাওয়ারড মানি’ হিসেবে পরিচিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যায়। এতে বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের গতি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ এখনো সরাসরি ঋণ সংকটে পড়েনি। তবে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি এড়ানো যাবে না। তাদের মতে, ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি, সুদ পরিশোধের চাপ এবং দুর্বল রাজস্ব কাঠামো— এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে চাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা আরও বলছেন, সময়মতো কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা না করা গেলে ঋণই ভবিষ্যতে অর্থনীতির বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাঁর মতে, দেশি ও বৈদেশিক ঋণ উভয়ই ক্রমাগত বাড়ছে এবং এর সুদ পরিশোধ এখন জাতীয় বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয়খাতে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপও সমানভাবে বাড়ছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষণে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমিত করজাল ও কর ফাঁকি, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি চাপ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা। এই কারণগুলো মিলিয়ে রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। অন্যদিকে ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকার ক্রমাগতভাবে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে করজাল সম্প্রসারণ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সাশ্রয়ী বৈদেশিক ঋণ ও বিকল্প অর্থায়নের উৎস বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।
অর্থনীতির কাগজে আজ যে ঋণের অঙ্ক বাড়ছে, তা শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি ধীরে ধীরে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকেও বেঁধে ফেলছে। প্রতিটি নতুন ঋণ যেন একেকটি প্রতিশ্রুতি, যা ফেরত দেওয়ার চাপ ভবিষ্যতের কাঁধে আরও ভারী হয়ে জমছে।
এখন প্রশ্নটা আর শুধু কত ঋণ নেওয়া হলো—তা নয়। প্রশ্নটা হলো, এই ঋণের ভেতর দিয়ে আমরা কোন অর্থনীতির দিকে হাঁটছি। কারণ যে অর্থনীতি ধার করে টিকে থাকে, সেই অর্থনীতির স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাও সময়ের সঙ্গে সংকুচিত হয়ে আসে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই—আজ যে ঋণ স্বস্তির সমাধান মনে হচ্ছে, কাল সেটাই যদি বাধ্যতামূলক বাস্তবতায় পরিণত হয়, তাহলে উন্নয়ন আর অগ্রগতির ভাষা বদলে যেতে পারে দায়, সুদ আর চাপের ভাষায়।
শেষ পর্যন্ত হিসাব হয়তো থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে—এই ঋণের পাহাড় কি সত্যিই উন্নয়নের জন্য তৈরি হচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে সেটাই উন্নয়নের পথকে আরও সংকীর্ণ করে তুলছে?

