২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এখন নতুন এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। যে ঘটনাকে ঘিরে ন্যায়বিচার, দায় নিরূপণ ও সত্য উদঘাটনের প্রত্যাশা ছিল, সেই মামলার অনেকগুলোই এখন ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, আর্থিক স্বার্থ আদায় এবং প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর চলমান তদন্তে এমনই একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
অভিযোগের আড়ালে ভিন্ন বাস্তবতা:
পিবিআইর তদন্তে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরকীয়াজনিত হত্যাকাণ্ডকে আন্দোলনকালীন সহিংসতা হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার জমি বা পারিবারিক বিরোধকে হত্যা বা গুমের মামলায় রূপ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে যেখানে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে মামলা করা হয়েছে। কোথাও পাওনা টাকা না দেওয়ার বিরোধকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে, আবার ডিভোর্সের জেরে স্ত্রী ও শ্বশুরালয়কে ফাঁসাতে পিতা নিজের ছেলের মাধ্যমে মিথ্যা মামলা করিয়েছেন—এমন অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
আরও দেখা গেছে, কিছু মামলায় বাদী নিজেই মামলার বিস্তারিত সম্পর্কে অবগত নন। কোথাও ভুক্তভোগীর পরিচয়, ঠিকানা ও ফোন নম্বরে অসংগতি রয়েছে। আবার তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাদীপক্ষ মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কতগুলো মামলা হয়েছে, তার জেলা ভিত্তিক তালিকা ডিসিদের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। এসব মামলা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, অনেক মামলায় বিপুল সংখ্যক আসামি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামি শনাক্ত করা হবে এবং যাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুক্ত করা হয়েছে, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া আইনগতভাবে সম্পন্ন হবে বলেও তিনি জানান।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত যাচাই করা মামলাগুলোর বড় অংশেই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং বিপুল সংখ্যক আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করতে হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—গণঅভ্যুত্থানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার পর দায়ের হওয়া এসব মামলা কতটা বাস্তব, আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তদন্তে আলোচনায় এসেছে একটি বিশেষ মামলা। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট অভ্যুত্থানে আহত হয়ে প্রায় দুই মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর আবু সাইদ (২৪) মারা যান—এমন দাবি করে তার বাবা রফিকুল ইসলাম আদালতে মামলা করেন।
মামলা নম্বর ২২৯৪/২০২৫ (শ্রীপুর)। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয়। তদন্তে নেমে পিবিআই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়। তবে তদন্ত যখন সত্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন বাদী রফিকুল ইসলাম আদালত থেকে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন।
প্রশ্নের মুখে বিচার প্রক্রিয়া:
পিবিআইর তদন্ত ও সরকারের যাচাই উদ্যোগ মিলিয়ে এখন স্পষ্ট হচ্ছে—গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর একটি অংশ বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে হয়নি। এতে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহ কামাল বলেন, একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তারা শুরু থেকেই নানা সমস্যার মুখে পড়েন। তাঁর ভাষায়, এজাহারে বাদীর ফোন নম্বর ছিল না। বাদীর আইনজীবীর কাছ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তিনি আরও জানান, ঠিকানার সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তদন্ত যখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আদালত থেকে জানানো হয় মামলাটি আর তদন্তের প্রয়োজন নেই, কারণ বাদী সেটি প্রত্যাহার করেছেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তদন্ত বন্ধ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, ওই ঘটনায় মূলত বাদীর ছেলেকে পরকীয়াজনিত বিরোধের জেরে একটি সেলুনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় পৃথক একটি মামলা চলমান রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য গোপন রেখে ‘জুলাই হত্যার’ অভিযোগে নতুন মামলা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। পরে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে বাদী মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন।
আরেকটি মামলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিতে আহত হওয়ার দাবি করে মামলা করা হয়। মামলা নম্বর ১৪৫৪/২০২৪ (বনানী)। আদালতের নির্দেশে তদন্তে নামে পিবিআই। তদন্তে দেখা যায়, মামলার বাদী, ভিকটিম, এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা—সবই একে অপরের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। ভিকটিমের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে হলেও এজাহারের নম্বরটি ঢাকার খিলগাঁও থেকে ব্যবহৃত হয়েছে।
পরে ওই নম্বরের সূত্রে খিলগাঁওয়ের একজন ব্যক্তিকে ডেকে পুলিশ জানতে পারে, তিনি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মামলার বাদী নিজেই জানান, তিনি এ ধরনের কোনো মামলা করেননি এবং বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। এরপর ভিকটিম পিবিআই সদর দপ্তরে লিখিত দিয়ে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
আদালতে ভিন্ন চিত্র, অভিযোগে অসংগতি:
আরেক ঘটনায় রাসেল নামে এক ব্যক্তিকে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত দেখিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করা হয়। মামলাটি দায়ের করেন রনি নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে নিহতের ভগ্নিপতি হিসেবে পরিচয় দেন (সিআর নম্বর ২৮৩/২০২৫)। তবে মামলার অভিযোগে একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে। আদালত বাদীকে একাধিকবার হাজির হতে নির্দেশ দিলেও তিনি উপস্থিত হননি।
অভিযোগে বলা হয়, যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের ওপর রাসেল নিহত হয়েছেন কিন্তু অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হয় চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ছবি, যা মামলার ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। এ অবস্থায় বিচারক মামলাটি ‘মিস কেস’ হিসেবে নথিভুক্ত করে সত্য উদঘাটনের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন।
তদন্ত শেষে পিবিআইর পরিদর্শক এম এ মনজুর বলেন, আদালতের নির্দেশে তারা বিস্তারিত তদন্ত করেন। তদন্তে দেখা যায়, মামলার বাদী রনি একজন প্রতারক। রাসেলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও জানান, পুরো মামলাটিই মিথ্যা ও ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
একাধিক মামলার তদন্তে এ ধরনের অসংগতি ও ভুয়া তথ্য উঠে আসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত মামলাগুলো কতটা বাস্তব আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা নিয়ে এখন তদন্তকারীদের মধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর আদালতে দায়ের হওয়া একটি সিআর মামলা (নম্বর ১০৫৩/২০২৫, মোহাম্মদপুর) তদন্তে নেমে নতুন ধরনের অসংগতি ধরা পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। তদন্তে দেখা যায়, মামলার প্রায় সব আসামির বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিনে। অথচ তাদের অনেকেই জীবনে কখনোই রাজধানী ঢাকায় আসেননি বলে তথ্য পাওয়া গেছে। একই ধরনের আরেকটি মামলায় (সিআর ৯৩১/২০২৫, মোহাম্মদপুর) প্রায় একই চিত্র পাওয়া যায়। সেখানেও সব আসামির ঠিকানা ভোলার বোরহানউদ্দিনে এবং তাদের রাজধানীতে কোনো উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি।
তদন্তে আরও একটি ঘটনাকে ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। এক মামলায় অভিযোগ করা হয়, মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড় দিয়ে বাসায় ফেরার সময় একজন লেগুনাচালকের পায়ে গুলি লাগে এবং তিনি আহত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, গুলি বের হয়ে গেলেও তিনি কোনো চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যান। পরে ওই ব্যক্তিকে ভিকটিম দেখিয়ে মামলা করা হয় অন্য একজনের মাধ্যমে। তবে ভিকটিম নিজেই তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, তিনি কোনো মামলা করেননি এবং এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মামলার তদন্তে এ ধরনের ঘটনা একাধিকবার সামনে এসেছে। একাধিক ক্ষেত্রে বাদী ও ভিকটিমের অবস্থান, পরিচয় ও ঘটনার বিবরণে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। পিবিআই সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ১৯৫টি মামলার তদন্ত দায়িত্ব পায় পিবিআই।
তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল: তদন্তে এখন পর্যন্ত পাওয়া চিত্র অনুযায়ী—
- ২৪টি মামলায় কোনো ধরনের প্রমাণ মেলেনি
- ২০টি মামলা বাদীপক্ষ প্রত্যাহার করেছে
- একই ঘটনায় জিআর মামলা থাকায় ৭টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে
- ১টি মামলার বাদী আদালতে উপস্থিত হননি
- ৫২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে
- ৫৩টি মামলা এখনো তদন্তাধীন
- ৯০টি মামলার সত্যতা পাওয়া গেছে
সব মিলিয়ে ১৪২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে পিবিআই। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ১৮টি, যার দুটি মামলায় কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অপ্রমাণিত মামলার চিত্র: পিবিআইর তথ্যে দেখা যায়, ২৪টি অপ্রমাণিত মামলার মধ্যে—
- ৬টি মামলায় বাদী বা ভিকটিমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি
- ৪টি মামলা পূর্বশত্রুতার ভিত্তিতে দায়ের করা
- ২টি মামলা ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে করা
- ৮টি মামলা সম্পূর্ণ ভুয়া ঘটনার ওপর ভিত্তি করে
- ৩টি মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বাদীর অসহযোগিতার কারণে প্রমাণ মেলেনি
- ১টি মামলা বাদীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক করানো হয়েছে
তদন্তের এসব তথ্য সামনে আসায় জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। একদিকে প্রকৃত ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ—এই দুইয়ের মাঝখানে এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থা।
পিবিআই সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক ৯০টি মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯টি হত্যা মামলা এবং ৮১টি অন্যান্য অভিযোগসংক্রান্ত মামলা। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭২৮ জন।
তদন্ত শেষে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৩ হাজার ১৭৪ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অন্যদিকে ৫ হাজার ৫৫৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণ মেলার হার ৩৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর প্রমাণ না মেলার হার ৬৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
যেসব মামলায় প্রমাণ মেলেনি:
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, একাধিক মামলায় অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। কিছু মামলায় বাদী বা সাক্ষীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, আবার কিছু ক্ষেত্রে তথ্যই ভুয়া বলে শনাক্ত হয়েছে। মিরপুরের একটি মামলা (সিআর ৮৯০/২০২৪)-এ বাদীর খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং দেওয়া ঠিকানাও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। একই ঘটনায় জিআর মামলা থাকায় সেটি খারিজ করা হয়।
আরেকটি মামলা (সিআর ১৪৫৪/২০২৪) প্রত্যাহার করা হয়েছে, কারণ তদন্তে ঘটনাস্থলের সঙ্গে অভিযোগের কোনো মিল পাওয়া যায়নি এবং বাদী ও সাক্ষীরা প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন। যাত্রাবাড়ীর একটি মিস কেস (২/২০২৫) ও সিআর ২৮৩/২০২৫ মামলায় বাদীর নাম, এনআইডি এবং ভুক্তভোগীর সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই ভুয়া বলে শনাক্ত হয়। একই ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে ৩০৭/২০২৫ নম্বর মামলাতেও, যেখানে আদালতে তলব করা হলেও বাদী উপস্থিত হননি।
একাধিক মামলায় দেখা গেছে, অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় আদালতের মাধ্যমে মামলা রিকল করে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৫৮/২০২৫, ৯৬৩/২০২৪ এবং ৫১৫/২০২৫ নম্বর সিআর মামলা। উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানার কয়েকটি মামলায় (৩৫/২০২৪, ২৪/২০২৪) দেখা গেছে, অভিযোগের ঘটনাই মিথ্যা। কোথাও জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও পুরনো আহত হওয়ার ঘটনাকে ‘জুলাইয়ের ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের ১০৫৩/২০২৫ নম্বর মামলায় তদন্তে পাওয়া যায়, বাদী ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন না। বরং পূর্বশত্রুতার জেরে মিথ্যা অভিযোগ আনার প্রমাণ মেলে। ভাটারা এলাকার ৩৮০/২০২৫ নম্বর মামলায়ও অভিযোগের সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণের মিল পাওয়া যায়নি।
কিছু মামলায় দেখা গেছে, ভিকটিম ঘটনাস্থলে ছিলেন না বা পুরো তথ্যই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ৭২২/২০২৪ নম্বর মামলায় সিডিআর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিকটিম ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং তিনি কোনো আঘাতও পাননি। কদমতলীর ৪৯১/২০২৫ মামলায় পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিবারের একাধিক সদস্যকে জড়িয়ে মামলা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আশুলিয়ার ১৬২৭/২০২৪ মামলায় বাদী, ভিকটিম এবং ব্যবহৃত এনআইডিসহ সব তথ্যই ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে ১৫৫০/২০২৪ মামলায় বাদীর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোম্পানীগঞ্জের ১৮৫/২০২৪ মামলায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাকে জুলাই আন্দোলনের ঘটনা হিসেবে দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ৮৪১/২০২৪ মামলায় বাদী আসামিদের চিনতেন না বলেও তদন্তে উঠে আসে, এবং অভিযোগ করা হয় তাকে জোর করে মামলা করানো হয়েছিল।
পিবিআইর পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ কালবেলাকে বলেন, অধিকাংশ অপ্রমাণিত মামলা বাদীর আবেদনের ভিত্তিতে আদালতে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিছু মামলা পূর্বশত্রুতার জেরেও দায়ের করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, প্রেমঘটিত বিরোধের ঘটনাও একটি মামলায় পাওয়া গেছে।
তার ভাষায়, সব মামলাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের পর যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কেবল তাদেরই আসামি করা হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলেনি, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ আদালতে পাঠানো হয়েছে।

