জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য উঠে আসছে। অনেক মামলায় এজাহারে যাদের আসামি করা হয়েছিল, তদন্ত শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও কিছু নাম। একই সঙ্গে বহু মানুষকে হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এমনই একটি ঘটনায় রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন বেলাল হোসেন রাব্বি নামে এক যুবক। গত ৪ আগস্ট বিকেলে তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর রাব্বির মা জেসমিন আক্তার শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়।
পরে মামলার তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে সংস্থাটি জানায়, এজাহারে উল্লেখ থাকা ২২ আসামির মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে রাব্বি হত্যার ঘটনায় কোনো সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এজাহারভুক্ত আরও ১২ জনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। পাশাপাশি তদন্তে নতুনভাবে আরও ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পিবিআই।
শুধু এই একটি মামলাই নয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট আরও বহু মামলার তদন্তেও মিলছে একই ধরনের তথ্য। পুলিশ বলছে, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছিল। এ কারণে ৭৯৮টি মামলায় মোট ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অন্তত ৪০টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে পুলিশ। সাধারণত কোনো মামলার তদন্ত শেষে সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়া গেলে বা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে আদালতে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়, সেটিই চূড়ান্ত প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে গত ১৬ মে পর্যন্ত জুলাইয়ের ১৭৫টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৮২৪ জন।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহত হওয়ার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি। বাকি ১ হাজার ৫৬টি মামলা হয়েছে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধারায়। জুলাই-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৭৫টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা। এসব হত্যা মামলায় মোট আসামি ৪ হাজার ৭২৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জন এজাহারে উল্লেখ ছিলেন। আর তদন্তের মাধ্যমে নতুন করে আরও ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম উঠে এসেছে।
অন্যদিকে হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারভুক্ত ছিলেন। বাকি ২ হাজার ৯২৭ জনকে তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করেছে পুলিশ।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব করতে অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এ নতুন ধারা ১৭৩ (এ) যুক্ত করে। এই বিধান অনুযায়ী, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির নাম হয়রানিমূলকভাবে এফআইআরে অন্তর্ভুক্ত হলে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন। আদালত সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। এই ধারার আওতায় ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানার ৩৫৪টি মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সিলেট মহানগরে ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জন, চট্টগ্রামে ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় ১টি মামলায় ৫ জন এবং রংপুরে ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
শুধু মহানগর এলাকাই নয়, বিভিন্ন রেঞ্জ পুলিশও এ ধরনের সুপারিশ আদালতে জমা দিয়েছে। ঢাকা রেঞ্জের ৯ জেলার ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৬ জেলার ৩৪টি মামলায় ৯৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ৮ জেলার ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৪ জেলার ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ৩ জেলার ১২টি মামলায় ২৮ জন, ময়মনসিংহের ৪ জেলার ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২ জেলার ২টি মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ৩ জেলার ২০টি মামলায় ১৪০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে ধারাবাহিক অগ্রগতি হচ্ছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (এ) ধারার কার্যকর প্রয়োগেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিরপরাধ মানুষের হয়রানি কমে এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
৬১ শতাংশ আসামির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়নি পিবিআই:
থানায় দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তভার পায় পিবিআই। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে আরও ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে ২৭২টি মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। এর মধ্যে ৮৪টি হত্যা মামলা এবং ১৮৮টি অন্যান্য ধারার মামলা। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এসব মামলার মধ্যে ১৬৫টির তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি হত্যা মামলা এবং ১২৩টি অন্যান্য ধারার মামলা। এখনও তদন্তাধীন রয়েছে ১০৭টি মামলা।
তদন্ত শেষ হওয়া ১৬৫ মামলার মধ্যে ১১১টিতে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে পিবিআই। অর্থাৎ প্রায় ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ মামলায় অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এসব মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি হত্যা মামলা এবং ৯২টি অন্যান্য ধারার মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে ৩১টি মামলায় অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই। এসব মামলার মধ্যে ১২টি সিআর মামলা এবং দুটি জিআর মামলাকে মিথ্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ ছিল। কোথাও বাদী আদালতে হাজির হননি, কোথাও মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আবার একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা দায়েরের ঘটনাও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আরও ২৩টি মামলা ভিন্নভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। অধিকাংশই ছিল সিআর মামলা। এসব মামলার বাদীরা অনীহা কিংবা অন্যান্য কারণে আদালতের কাছে আবেদন করে মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে এজাহারভুক্ত আসামিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে পাওয়া তথ্য। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারে মোট ৯ হাজার ৬৯১ জনের নাম ছিল। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্ব শত্রুতা, প্রতিশোধপরায়ণতা কিংবা কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অনেকের নাম এজাহারে যুক্ত করা হয়েছিল। এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে আসামি করা ব্যক্তিরা ঘটনার সময় ঢাকায়ই ছিলেন না, কেউ কেউ কয়েক বছর ধরেই রাজধানীর বাইরে অবস্থান করছিলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক মামলা:
মুদি দোকানী মো. জামাল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ভাড়া থাকেন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে মামলা করেন তিনি।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে আশপাশের বিভিন্ন অলিগলি থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীরা গুলি চালালে জামাল গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঘটনার পর হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে মামলা করেন জামাল। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ১৯৭ জনকে আসামি করা হয়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত শেষে সংস্থাটি জানিয়েছে, এজাহারভুক্ত ১৯৭ জনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, এখনও তদন্তাধীন থাকা ১০৭টি মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি, মেডিকেল সনদ সংগ্রহ এবং কিছু মামলায় একত্রে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রক্রিয়া। এসব কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

