গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় সেটির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। এর পর সরকার গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে সেই আইনের খসড়া প্রস্তুত হয়েছে এবং তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে বাতিল হওয়া অধ্যাদেশের কয়েকটি বিধান সংশোধনের পাশাপাশি নতুন কিছু ধারা সংযোজনের প্রস্তাবও আসে। খসড়া অনুযায়ী, গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি আগের অধ্যাদেশের মতোই মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। তবে কারাদণ্ডের বিধান এবং তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা খসড়া আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
সূত্রের ভাষ্য, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এ খসড়া নিয়ে আরও একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, বিদেশি মিশনের প্রধান এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। নতুন আইন সম্পর্কে তাদের মতামতও নেওয়া হবে।
খসড়ায় একটি নতুন বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি টানা পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকলে তাঁর পরিবার আদালতের মাধ্যমে গুমের সনদ সংগ্রহ করতে পারবে। সেই সনদের ভিত্তিতে নিখোঁজ ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি বণ্টন, ব্যাংকিং কার্যক্রমসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে স্বজনরা সহায়তা পাবেন।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, সরকারি কোনো সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে পরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও বিস্তৃতভাবে গুম সংঘটিত হলে তার তদন্ত করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ গুমের ঘটনার তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে এ ধরনের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
গুম প্রতিরোধ আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত আইন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, খসড়ায় চার ধরনের অপরাধকে গুমের আওতায় আনা হয়েছে। এগুলো হলো— গুম, গুমের কারণে মৃত্যু, আলামত নষ্ট করা এবং গোপন আটককেন্দ্র তৈরি। পাশাপাশি গুমে সহযোগিতার বিষয়টিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ কোনো ব্যক্তির স্বজন মামলা করলে এবং তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে গ্রহণযোগ্য হলে গুমের সনদ দেওয়া হবে। এরপর সেই সনদের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর, বিক্রি কিংবা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
আরেকটি সূত্র জানায়, সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা সদস্য যদি ধারাবাহিক গুমে জড়িত না থেকে বিচ্ছিন্নভাবে একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হন, তাহলে সেই ঘটনার তদন্ত করবে পুলিশ। কেবল পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক গুমের অভিযোগই তদন্ত করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন খসড়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের তুলনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে গুমের সর্বনিম্ন শাস্তি ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ডের কথা ছিল। এছাড়া তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানো যাবে। এরপরও তদন্ত শেষ না হলে আদালতকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। বিচার শেষ করার সময়সীমা রাখা হয়েছে ১২০ দিন। নির্ধারিত সময়ে বিচার সম্পন্ন না হলে তিন দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে।
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, পদ্ধতিগত গুমের যেসব মামলার তদন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল করবে, সেসব ক্ষেত্রে গুমের সনদও যেন ট্রাইব্যুনাল থেকেই দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এতে ভুক্তভোগী পরিবারের ভোগান্তি কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব মামলার তদন্ত পুলিশ করবে, সেসব ক্ষেত্রে সনদ প্রদান করবে বিচারিক আদালত।
প্রায় এক মাস আগে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত একটি কর্মশালায় প্রথমবারের মতো গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া উপস্থাপন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খসড়ার ওপর বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আইন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব খসড়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা নিজেদের মতামত উপস্থাপন করেন।
একাধিক সূত্রের দাবি, বৈঠকে কেউ কেউ পৃথক আইন না করে প্রচলিত দণ্ডবিধি সংশোধনের মাধ্যমে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। তাদের যুক্তি, বলপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী অনেক দেশ বিদ্যমান আইন সংশোধন করেই এ ধরনের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করেছে।
আবার কেউ কেউ হেফাজতে নিবারণ আইনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আইন একত্র করে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের পরামর্শ দেন। তাদের মতে, সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততা রয়েছে— এমন কয়েক ধরনের অপরাধকে একই আইনের আওতায় আনা যেতে পারে। হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও সেই ধরনের অপরাধের মধ্যে পড়ে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বিভিন্ন মতামত পর্যালোচনার পর গুমকে স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে পৃথক আইন প্রণয়নের দিকেই সরকার এগোচ্ছে। তবে নতুন আইনে কোনো গুম কমিশন রাখার পরিকল্পনা নেই।
এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, গুমের তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া যেতে পারে। সেখানে মানবাধিকারকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তাঁর মতে, যেসব বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেই বাহিনীকেই তদন্তের দায়িত্ব দিলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা থাকবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিষয়টি যে দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করেছিল, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কোথাও ত্রুটি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা সংশোধন করা যেতে পারে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে টানা ১৫ বছরে বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে বহু মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করে। বর্তমানে গুমের ঘটনায় র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের জন্য বিল আকারে উত্থাপন না হওয়ায় সেটি বাতিল হয়ে যায়। পরে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় অধ্যাদেশটি হুবহু আইন না করে সংশোধিত আকারে নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে। পাঁচ সদস্যের কমিশনটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩১২ জন নেতাকর্মী গুমের শিকার হন, যাদের মধ্যে ১০৭ জন আর ফিরে আসেননি। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ৭৪৭ জন নেতাকর্মী গুম হন, যাদের মধ্যে ৩৫ জনের আর খোঁজ মেলেনি। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গুম থেকে ফিরে আসা ৯৪৮ জন ব্যক্তির রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল।

