আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচালিত কথিত ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ‘এনকাউন্টার’সহ বিভিন্ন অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ সরকারি তথ্য ও তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
নোটিশটি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের (এনএলসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু জনস্বার্থে এই নোটিশ পাঠিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তিনি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে সংশ্লিষ্টদের কাছে নোটিশ প্রেরণ করেন।
নোটিশে বলা হয়েছে, এটি পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আটটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনানুগ ও সন্তোষজনক তথ্য সরবরাহ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না এলে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে সরকারি নথির ভিত্তিতে আটটি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রথমত, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে কথিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার বা অনুরূপ অভিযানে মোট কতজন নিহত হয়েছেন তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। তালিকায় প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির নাম, পিতা বা মাতার নাম, ঠিকানা, পরিচয় এবং ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কোন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কোন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি করা হয়েছে। তৃতীয়ত, অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা এবং আইন অনুযায়ী প্রকাশযোগ্য সীমার মধ্যে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম, পদবি এবং বর্তমান কর্মস্থলের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
চতুর্থত, প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এফআইআর, সাধারণ ডায়েরি (জিডি), সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত, বিভাগীয় তদন্ত এবং অন্যান্য সরকারি অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা ও প্রকাশযোগ্য ফলাফল জানাতে বলা হয়েছে।
পঞ্চমত, কোনো ঘটনায় সরকারি তদন্ত, বিচারিক অনুসন্ধান বা আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সেটিকে বেআইনি বা বিচারবহির্ভূত হত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকলে তার দালিলিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। ষষ্ঠত, এসব ঘটনার দায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয়, প্রশাসনিক বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, পদবি, গৃহীত ব্যবস্থা, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং চূড়ান্ত ফলাফল জানাতে বলা হয়েছে।
সপ্তমত, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকার কোনো ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন বা মানবিক সহায়তা দিয়ে থাকলে তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি করা হয়েছে। অষ্টমত, ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিচারবহির্ভূত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কী ধরনের নীতিমালা, নির্দেশনা কিংবা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, সে তথ্যও প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকার আলী জুনুর দাবি, বিগত সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ রয়েছে, যা নাগরিকের সাংবিধানিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর ভাষ্য, অতীতের এসব ঘটনার বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

