Innocent until proven guilty – দোষ প্রমান না হওয়া পর্যন্ত নিদোর্ষ, এ কথাটি আমরা সবাই কম বেশি শুনেছি। কিন্ত এই কথার কতটা বাস্তবিক প্রতিফলন দেখা যায় তা সবসময় একটা বিতর্কের বিষয় রয়েছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো, দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে নির্দোষ বলে গণ্য করা। তখন Burden of Proof বা দোষ প্রমানের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় প্রসেকিউশানের উপর। বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলের মাধ্যমে এই নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশে অভিযুক্তের অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭ক) মৌলিক অধিকারসমূহ লিপিবদ্ধ রয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের সুরক্ষার সাথে সম্পর্কিত।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২: প্রতিটি নাগরিক ও বাংলাদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ৩৩ গ্রেপ্তার ও আটকাদেশ সংক্রান্ত সুরক্ষা প্রদান করে। অনুচ্ছেদ ৩৫ বিচার ও দণ্ড সংক্রান্ত সুরক্ষা প্রদান করে, যার মধ্যে রয়েছে পূর্ববর্তী কার্যকর আইন ছাড়া দণ্ডিত না হওয়া (ex post facto), একই অপরাধে একাধিকবার বিচার ও শাস্তির নিষেধ (Doctrine of Double Jeopardy), স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করে।
ফৌজদারি কার্যবিধি প্রদত্ত পদ্ধতিগত সুরক্ষা
ধারা ৫৪, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure) সাংবিধানিক নীতিগুলোকে বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত কাঠামো প্রদান করে। কিন্ত ধারা ৫৪ অনুযায়ী পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করতে পারবে। যদিও, ফৌজদারী আইন সংশোধনী ২০২৫ অনুযায়ী, কাউকে বিনা ওয়ারেন্টে কাউকে গ্রেপ্তার করলে, গ্রেপ্তারের সময় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে অবশ্যই তার গ্রেপ্তারের কারন জানাতে হবে। পুলিশি গ্রেপ্তারের অপব্যবহার রোধ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে ধারা ৫৪-সহ সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তারের আগে (pre-arrest) ও পরে (post-arrest) অনুসরণীয় বিধানগুলো কে কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ধারা ১৬৭ তদন্ত ও রিমান্ড কালীন অধিকার নিয়ে ধারা ১৬৭- এ বলা হয়েছে তদন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্তকে অতিরিক্ত হেফাজতে (রিমান্ডে) পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন। বিধানটির উদ্দেশ্য তদন্তের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হলেও, গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে রিমান্ড-চলাকালীন সময়ে নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা।
যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক সুরক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় অভিযুক্তের অধিকার মূলত ১৭৯১ সালে গৃহীত অধিকার সনদ (Bill of Rights) এর চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম সংশোধনীতে নিহিত। চতুর্থ সংশোধনী অযৌক্তিক তল্লাশি ও জব্দ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং যুক্তিসঙ্গত কারণ ভিত্তিক পরোয়ানার শর্ত আরোপ করে। পঞ্চম সংশোধনী আত্ম-অভিযুক্তি থেকে সুরক্ষা, দ্বৈত শাস্তির নিষেধ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে। ষষ্ঠ সংশোধনী দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার, নিরপেক্ষ জুরি, সাক্ষীদের জেরা করার অধিকার এবং আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। অষ্টম সংশোধনী অতিরিক্ত জামিন, অতিরিক্ত জরিমানা এবং নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির নিষেধ আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাঃ কমন ল ও PACE ১৯৮৪
যুক্তরাজ্যে অভিযুক্তের অধিকার নিশ্চিত ঐতিহাসিকভাবে কমন ল নীতির মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে যা Woolmington v DPP [1935] AC 462 নামক একটি হাউজ অফ লর্ডসের ল্যান্ডমার্ক কেইসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মামলার মূল নীতি হলো ফৌজদারি মামলায় আসামির দোষ রাষ্ট্রপক্ষ বা প্রসিকিউশনকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। একে ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার “গোল্ডেন থ্রেড” বা স্বর্ণসূত্র বলা হয়।
তবে আধুনিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো পুলিশ ও ফৌজদারি সাক্ষ্য আইন, ১৯৮৪ (Police and Criminal Evidence Act—PACE), যা পুলিশি ক্ষমতা ও ব্যক্তি-অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে প্রণীত হয়। PACE কোড C অনুযায়ী হেফাজতে থাকা সন্দেহভাজনের বিনামূল্যে ও স্বাধীনভাবে আইনি পরামর্শ পাওয়ার অধিকার, কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে অবহিত করার অধিকার এবং জিজ্ঞাসাবাদ রেকর্ড করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন (ECHR)
ইউরোপ পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য অভিযুক্তের অধিকারের মূল আঞ্চলিক কাঠামো হলো ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৫ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার সুরক্ষা দেয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ জানানো ও দ্রুততার সাথে বিচারিক পর্যালোচনার শর্ত আরোপ করে। অনুচ্ছেদ ৬ ন্যায্য বিচারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, যার মধ্যে রয়েছে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে প্রকাশ্য শুনানি, নির্দোষতার অনুমান, অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত ও বোধগম্য ভাষায় অবহিতকরণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময়।

বাংলাদেশের জন্য সংষ্কারের দিক
জিজ্ঞাসাবাদে আইনজীবীর উপস্থিতি, Salduz বনাম Turkey, ECtHR (২০০৮)
ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের গ্র্যান্ড চেম্বার Salduz বনাম Turkey মামলায় রায় দেয় যে ন্যায্য বিচারের অধিকার (ECHR অনুচ্ছেদ ৬) ‘বাস্তবিক ও কার্যকর’ রাখতে হলে, ব্যতিক্রমী ও চাপযুক্ত কারণ না থাকলে, পুলিশের প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই সন্দেহভাজনকে আইনজীবীর সহায়তা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশের ধারা ১৬৪ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তি রেকর্ডের সময় আইনজীবীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়, এবং রিমান্ডকালীন পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও তা অনুপস্থিত। শিক্ষণীয় দিক হলো বিশেষত নাবালক ও দুর্বল শ্রেণির অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি রেকর্ডের সময় আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
স্বতন্ত্র হেফাজত কর্মকর্তা, PACE ১৯৮৪, কোড C
যুক্তরাজ্যের PACE আচরণবিধির অনুরূপ সুনির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য হেফাজত-ব্যবস্থাপনা নিয়মাবলী প্রণয়ন বাংলাদেশে রিমান্ড-সংক্রান্ত অপব্যবহার হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। PACE ১৯৮৪-এর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি থানায় একজন স্বতন্ত্র ‘হেফাজত কর্মকর্তা’ (custody officer) নিয়োগ করা হয়, যিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা থেকে পৃথক এবং যার দায়িত্ব হেফাজতে রাখার সিদ্ধান্ত, হেফাজতের প্রতিটি পদক্ষেপ আর অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে সাধারণত একই থানা বা তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রেপ্তার, হেফাজত ও জিজ্ঞাসাবাদ—সবকিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন, যা জবাবদিহিতার ঘাটতির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংষ্কারের দিক হলো থানা পর্যায়ে তদন্ত থেকে পৃথক একজন হেফাজত-ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা নিয়োগ করা।
বর্জন নীতি, Mapp বনাম Ohio, ৩৬৭ US ৬৪৩ (১৯৬১)
১৯৬১ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট Mapp VS Ohio মামলায় রায় দেয় যে চতুর্থ সংশোধনী লঙ্ঘন করে ( পরোয়ানা ছাড়া অবৈধ তল্লাশির মাধ্যমে) সংগৃহীত সাক্ষ্য রাজ্য পর্যায়ের আদালতেও অগ্রহণযোগ্য, কারণ অন্যথায় সাংবিধানিক সুরক্ষা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই ‘বর্জন নীতি’ (exclusionary rule) পুলিশকে বৈধ পদ্ধতিতে সাক্ষ্য সংগ্রহে বাধ্য করার একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা তৈরি করে। বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ জোরপূর্বক আদায়কৃত স্বীকারোক্তি বাদ দেওয়ার বিধান রাখলেও, অবৈধ তল্লাশি বা জব্দের মাধ্যমে প্রাপ্ত ভৌত সাক্ষ্য (যেমন মাদক, অস্ত্র) বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুরূপ সুস্পষ্ট নীতি অনুপস্থিত।
- জয়দীপ ঘোষ এলিন, লিগ্যাল রিসার্চার, সিটিজেন ভয়েস

