বর্তমান বাংলাদেশ বিচারিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে মামলা জট ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। প্রতিদিন যেই পরিমান নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে, ঠিক সমপরিমাণ মামলা কিন্ত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বর্তমানে মামলা দায়ের করা একটা জাদুকরি গাছের মতো, যা সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে, কিন্ত সেই গাছ থেকে কোন ফল পাওয়া যায় না, কিন্ত প্রতিদিন আপনাকে গাছের গোড়ায় পানি দিত হয়।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, অপ্রতুল বিচারিক ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা চলমান রয়েছে।
এই মামলা জালে আটকে আছে অর্থ ঋন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াও। অর্থঋন আদালত তৈরী করা হয়েছিলো ২০০৩ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষায়িত দেওয়ানী আদালত হিসেবে। সাধারণত দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের লক্ষ্যেই অর্থ ঋণ আদালত আইনে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এই আদালত আজ নিজেরাই মামলাজট, বিচারক-সংকট আর অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধার শিকার।
একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক অর্থ ঋণ আদালত থাকলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক না থাকায় কয়েকটি আদালতের কার্যক্রম সীমিত জনবল দিয়ে পরিচালনা করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একাধিক আদালতের দায়িত্ব একজন বিচারকের ওপর পড়ছে। রাজধানীর এই চিত্র দেশের অন্যান্য জেলা পর্যায়ের অর্থ ঋণ আদালতের পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। পর্যাপ্ত বিচারক, জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে অনেক ক্ষেত্রে মামলার নিষ্পত্তির গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।
তবে সব জায়গায় পরিস্থিতি একই নয়। চট্টগ্রামের অর্থ ঋণ আদালতের কার্যক্রমে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সাড়ে তিন বছরে প্রায় ২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা ঋণ আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে, যা বিশেষায়িত আদালতের কার্যকারিতার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থঋন আদালতের বিচারিক স্থবিরতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাজু হাওলাদার পলাশ- সিটিজেন্স ভয়েসকে বলেন, মামলা বিলম্বনার পিছনে ঋন গ্রহিতার অনিয়ম হিসাব আর কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপিত না হওয়ার কারনে মামলা বার বার মুলতবি হয় । এছাড়া বিচারকের অপর্যাপ্ততাকেও একটি কারন বলে মনে করেন।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি আরও বলেন, আদালতে প্রযুক্তি নির্ভর মামলা সম্পাদনা প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করা দরকার এবং দ্রুততার সাথে বিচারক নিয়োগের কথাও উল্লেখ করেন। জামানত সম্পত্তি যাতে দ্রুততার সাথে বিক্রি হয় সেইদিকেও সরকারকে নজর দিতে বলেছেন এডভোকেট রাজু হাওলাদার পলাশ।
বিচারিক স্থবিরতার কারন বিশ্লেষন করলে দেখা যায়- আইনগত ও প্রক্রিয়াগত বিলম্ব যেমন- সমন জারি বিলম্ব, অতিরিক্ত টাইম পিটিশন দায়ের, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিচারক নিয়োগের ধীরগতি ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ ঋণ আদালতের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত ঋণ আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি এই আদালতগুলোও দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে, তাহলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রিট-প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধ, সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করা এবং বিচারিক জনবল বৃদ্ধি একযোগে না করলে মামলাজট কমার সম্ভাবনা সীমিত থেকে যাবে।
- জয়দীপ ঘোষ এলিন: লিগ্যাল রিসার্চার, সিটিজেন্স ভয়েস

