বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ আবারও পিছিয়েছে। এবার নিয়ে ৯৭তমবারের মতো প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ল। আজ ৯ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তা দিতে পারেনি। পরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাশিতা ইসলাম আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। ফলে প্রায় এক দশক আগে দায়ের হওয়া এই বহুল আলোচিত মামলার তদন্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি। চলতি বছরেও এর আগে একাধিকবার প্রতিবেদন জমার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও প্রতিবারই তদন্তকারী সংস্থা প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা বাংলাদেশের হিসাব থেকে হ্যাকাররা বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। মোট প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলারের লেনদেনের নির্দেশ পাঠানো হলেও এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের কয়েকটি হিসাবে চলে যায়। শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর জন্য নির্ধারিত আরও ২ কোটি ডলারের লেনদেন বানানসংক্রান্ত ভুলের কারণে আটকে যায়। পরে ফিলিপাইন থেকে প্রায় দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ ঘটনার এত বছর পরও চুরি যাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশের আর্থিক খাত নয়, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিরাপত্তা ও অর্থপাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন হিসাব ও বাজেটিং বিভাগের উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মতিঝিল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন। পরদিন মামলাটির তদন্তভার সিআইডির কাছে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই সংস্থাটি ঘটনাটি তদন্ত করছে। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও এখনো আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে নানা তথ্য সামনে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির বিষয়ও উঠে এসেছিল। তবে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়ায় ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, অর্থ সরানোর পেছনে দেশের ভেতর থেকে কারও সহযোগিতা ছিল কি না এবং পুরো অর্থপাচারের সঙ্গে কারা যুক্ত—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো আদালতের সামনে আসেনি।
রিজার্ভ চুরির এই ঘটনা বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে শুধু বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর ঘটনা নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক লেনদেনের ঝুঁকি এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। এত দীর্ঘ সময় পরও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া মামলাটির বিচারিক অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময় যত বাড়ে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও অর্থের গতিপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখন সবার নজর আগামী ১৪ সেপ্টেম্বরের দিকে—সিআইডি এবার সত্যিই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে কি না, নাকি দেশের অন্যতম আলোচিত আর্থিক অপরাধের মামলাটির তদন্তের সময় আরও বাড়ে।

