পরিচয় জালিয়াতির শিকার হয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা কক্সবাজারের দিনমজুর সোনা মিয়া অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন। আদালতের বেঁধে দেওয়া চারটি শর্ত মেনে গতকাল শুক্রবার কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কারাগার কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, আদালতের নির্দেশনা হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছিলেন নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে।
আদালতের নির্ধারিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—সোনা মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখা, আদালতের অনুমতি ছাড়া বাসস্থান পরিবর্তন না করা, নির্ধারিত তারিখে নিয়মিত হাজিরা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানিয়ে রাখা। একই সঙ্গে সাময়িকভাবে তাঁর বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার স্থানীয় থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হবে তাঁকে, আর থানাকেও প্রতি তিন মাস অন্তর তাঁর উপস্থিতি নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে। ওই বছর প্রায় দুই লাখ ইয়াবা বড়িসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের একজন নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে প্রকৃত সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেন। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর আদালত এই মামলার পাঁচ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
জটিলতা প্রকাশ্যে আসে চলতি বছরের ২৪ জুন, যখন প্রকৃত অপরাধীর বদলে আসল সোনা মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে গিয়ে তিনি বারবার দাবি করতে থাকেন, ইয়াবা মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। এ পর্যায়ে কারা কর্তৃপক্ষ পুরোনো মামলার নথিতে থাকা ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য ও মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে বড় ধরনের গরমিল খুঁজে পায়। বিষয়টি নজরে আসার পর আদালত পুলিশকে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেন।
তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—২০২০ সালে ইয়াবাসহ ধরা পড়া ব্যক্তি আসলে সোনা মিয়া ছিলেনই না। তিনি ছিলেন একজন রোহিঙ্গা নাগরিক, যিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে সোনা মিয়ার জন্মসনদ ব্যবহার করে আইনি জটিলতা এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই ভুল পরিচয়কে ভিত্তি ধরেই মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র প্রণয়ন ও গোটা বিচারিক প্রক্রিয়া চলতে থাকে বছরের পর বছর।
সংশ্লিষ্ট থানার পক্ষ থেকে গত ৫ জুলাই আদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে কারাগারে আটক সোনা মিয়া প্রকৃতপক্ষে ২০২০ সালের ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন। প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তি ভিন্ন এক রোহিঙ্গা নাগরিক, যিনি সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে জামিন নিয়ে পরে গা ঢাকা দেন। তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
সোনা মিয়ার পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী আইনজীবী জানান, মামলার তদন্ত পর্যায়েই প্রকৃত আসামির পরিচয় সঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি, আর এই গাফিলতির খেসারত দিতে হয়েছে একজন সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষকে—দীর্ঘদিন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পরই জামিনের আবেদন করা হয়। সব নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা শেষে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।
দীর্ঘ কারাভোগ আর জটিল আইনি লড়াই শেষে শুক্রবার অবশেষে মুক্ত আকাশের নিচে ফেরেন সোনা মিয়া। কারাফটকে তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা।
এই ঘটনাটি একদিকে যেমন দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আসামি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে, তেমনি প্রশ্ন তুলেছে তদন্তকালীন পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্ব নিয়েও। একজন নিরপরাধ মানুষের এত বছরের কারাভোগ ও মানসিক যন্ত্রণার দায় কার—এই প্রশ্নের সুরাহা এখনো অমীমাংসিত থেকে গেছে।

