যুক্তরাজ্যে আটকে থাকা আড়াই কোটি ডলার উদ্ধারে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। এই অর্থ ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর নামে যুক্তরাজ্যে জমা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, অর্থ পাচার ও অবৈধ স্থানান্তরের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর করা আবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আগামী এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এই আদেশ দেন। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে দুদক ও এর চেয়ারম্যান, বিএফআইইউ প্রধান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং শওকত আলী চৌধুরীকে।
রিটকারীর পক্ষে আদালতে অংশ নেওয়া একজন আইনজীবী জানান, সাবেক এক ভূমিমন্ত্রীর যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানের সময় দেশটির অপরাধ তদন্ত সংস্থা শওকত আলী চৌধুরীর নামে একটি ব্যাংক হিসাবে অঘোষিত আড়াই কোটি ডলারের সন্ধান পায়।
রিট আবেদন সূত্রে জানা যায়, শওকত আলী সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিক এবং আলোচিত এক ব্যবসায়ীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তদন্তের সময় তিনি অর্থের উৎস সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এমনকি তদন্ত চলাকালীন তিনি ওই অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে দুটি ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই সন্দেহজনক লেনদেন ধরা পড়ার পর যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ তা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে বিষয়টি বিএফআইইউকে অবহিত করে। রিটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার আইনি পদক্ষেপ নিলে অর্থটি ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে যুক্তরাজ্যের সংস্থাটি জানিয়েছিল এবং এ জন্য চার সপ্তাহ সময়ও বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএফআইইউ কোনো যোগাযোগ করেনি, বাংলাদেশ সরকারও কোনো আইনি উদ্যোগ নেয়নি।
আইনজীবী আরও জানান, এরপর যুক্তরাজ্যের সংস্থাটি অর্থ স্থানান্তরে আর বাধা না দেওয়ায় শওকত তা দুবাইয়ে নিজের হিসাবে সরিয়ে নেন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই বিদেশি সম্পদের বিষয়ে জানতে পারে এবং শওকত নিজের আয়কর রিটার্নে ওই অর্থ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা দেন।
রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে শওকত এক শ ছত্রিশ কোটি টাকা আয়কর এবং প্রায় তিন শ সাত কোটি টাকা জরিমানা পরিশোধ করেন। তবে অর্থের প্রকৃত উৎস এবং তা কীভাবে দেশের বাইরে সরানো হয়েছিল, সে বিষয়ে দুদক বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থা কোনো অনুসন্ধান চালায়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়, যথাযথ তদন্ত হলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের নির্দিষ্ট ধারায় শওকতের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যেতে পারত।
আইনজীবী জানান, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে আরেকজন আইনজীবী এই অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য দুদক ও বিএফআইইউতে পৃথক আবেদন করেছিলেন। কিন্তু মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের নির্দিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি বিএফআইইউ।
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাজ্যের সংস্থার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশকে একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেওয়ায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এ কারণেই দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার আবেদন জানানো হয়েছে।
রিট আবেদনে যুক্তরাজ্যের তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ জব্দে ব্যর্থতা, উৎস অনুসন্ধানে ব্যর্থতা এবং পাচারের অভিযোগে ব্যবস্থা না নেওয়াকে কেন এখতিয়ারবহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে আবেদনে।
রুল জারির পর সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, বিএফআইইউর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কারণেই দেশের এই বিপুল অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হয়নি, আর এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে আদালত রুল জারি করেছেন।

