জাল জন্মসনদ তৈরি করে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের শিশু হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে জামিন করানোর অভিযোগের তদন্তে এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে একাধিক জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে আদালত। একই কৌশলে পরপর তিনটি মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত আসামিদের শিশু দেখিয়ে জামিন করানোর তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
শুধু জাল জন্মসনদ ব্যবহার নয়, একটি মামলার নথি প্রায় নয় মাস গায়েব রাখা, আদালতের আদেশের নথিতে কাটাকাটি এবং অন্য এক নবীন নারী আইনজীবীর স্বাক্ষর ও সিল জাল করে দায় এড়ানোর চেষ্টার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (চৌকি) আদালতের বিচারক এস এম গালিব হাসান গত ১৯ আগস্ট আদালতে এ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে মূল অভিযুক্ত আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের আইনজীবী সনদ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সহকারী (মুহুরী) হাসান আলীর নিবন্ধনপত্র বা আইনজীবী সমিতিতে কাজের অনুমতিপত্র বাতিল এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের তৎকালীন জিআরও পুলিশ সদস্য আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত হ্যাকার চক্রের সদস্য পলাশ রানাকে ঘিরে। গত বছরের ১৫ জুলাই যৌথ বাহিনীর অভিযানে গোবিন্দগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার এজাহারে পলাশের বয়স ২৫ বছর উল্লেখ থাকলেও পরে জাল জন্মসনদ তৈরি করে তাকে শিশু হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে জামিন নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি জেলা বারের আইনজীবী সরওয়ার হোসেন বাবুলসহ কয়েকজন আইনজীবী আদালতের নজরে আনেন। পরে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে আদালতপাড়ায় আলোচনা শুরু হয়। এর পর আদালতের তদন্তে আইনজীবী রিপনের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলায় একই ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে গোবিন্দগঞ্জ থানার জিআর ৩৮৩/২০২৪ মামলার নথি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, মামলার চার আসামির মধ্যে শাওন মিয়া, শামীম চৌধুরী ও এনামুল হক প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু জাল জন্মসনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র ব্যবহার করে তাঁদের শিশু হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে শিশু আদালত-২ থেকে জামিন করানো হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
একইভাবে জিআর ৩২৩/২০২৫ ও জিআর ৩৩১/২০২৫সহ আরও কয়েকটি মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত আসামিদের শিশু দেখিয়ে জামিন নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। অনলাইন সার্ভেয়ারের মাধ্যমে যাচাইয়ের পর এসব মামলায় জামিনের সময় আদালতে দাখিল করা জন্মসনদগুলো জাল ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আড়াল করতে অন্য এক নবীন নারী আইনজীবীর স্বাক্ষর ও সিলও জাল করা হয়েছে। জিআর ৩৩১/২৫ মামলার প্রাপ্তবয়স্ক আসামি আশিক মিয়াকেও একই কৌশলে শিশু হিসেবে দেখিয়ে জামিন করানো হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরে আদালতের নথি থেকে আইনজীবী রিপনের দাখিল করা জামিননামা, বেল বন্ড, জাল জন্মসনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরিয়ে ফেলা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে তাছলিমা খাতুন নামে এক আইনজীবীর স্বাক্ষর করা ওকালতনামা ও বেল বন্ড নথিতে যুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ।
তাছলিমা খাতুন ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ পাওয়া একজন নবীন আইনজীবী। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার নামীয় সিল ও স্বাক্ষর জাল করে জামিনের আবেদন, ওকালতনামা ও বেল বন্ড আদালতে দাখিল করা হয়।
ঘটনাটির সময় নিয়েও তদন্তে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। তাছলিমার জাল স্বাক্ষরযুক্ত ওকালতনামাটি গাইবান্ধা বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে বিক্রি হয় ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট। অথচ ওই ওকালতনামা ব্যবহার করে আসামির জামিন নেওয়া হয় তার চার দিন আগে, ১০ আগস্ট।
বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর আদালতের নির্দেশে আইনজীবী রিপন ও তার সহকারী হাসান আলীর বিরুদ্ধে গাইবান্ধা সদর থানায় ফৌজদারি মামলা করা হয়। মামলাটি জিআর ৩৭২/২০২৫ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
তদন্তে আদালতের নথি ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি মামলার নথি প্রায় নয় মাস গায়েব ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের আদেশের নথিতে কাটাকাটি এবং নথিতে পরিবর্তন আনার অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া গেছে।
আইনজীবী রিপনের সহকারী হাসান আলী তদন্তের সময় তার সহকারী হিসেবে কাজ করার কথা স্বীকার করলেও আদেশের নথিতে কাটাকাটির বিষয়ে নিজের দায় অস্বীকার করেন। অন্যদিকে তৎকালীন জিআরও আব্দুস সবুর নথির আদেশের অংশে কাটাকাটির বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে শিশু আদালতে নথি হস্তান্তরের সময় সেখানে কোনো কাটাকাটি ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। প্রায় নয় মাস নথি গায়েব থাকার বিষয়েও তিনি নিজের দায় অস্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্তের সময় অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়। আইনজীবী রিপন দাবি করেন, তিনি শুধু বেইলবন্ডে স্বাক্ষর করেছেন; ওকালতনামা বা জামিনের আবেদনে তার স্বাক্ষর ছিল না। তবে ওকালতনামা ছাড়া তিনি কীভাবে সংশ্লিষ্ট মামলায় জামিন শুনানিতে অংশ নিয়েছেন—তদন্তে এমন প্রশ্ন তোলা হলেও এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারী বিচারক প্রতিবেদনে বলেন, বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পেতে সহায়তা করা আইনজীবীদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সহকর্মী এক নারী আইনজীবীর স্বাক্ষর জাল করা, আদালতের নথি থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে ফেলা এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের শিশু হিসেবে দেখিয়ে জামিন করানোর মতো ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর।
এসব ঘটনাকে দেশের সামগ্রিক বিচার বিভাগের জন্য ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। পেশাগত শপথ ভঙ্গ ও ধারাবাহিক জালিয়াতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের সনদ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে তার সহকারী হাসান আলীর গাইবান্ধা জেলা আইনজীবী সমিতিতে কাজ করার অনুমতিপত্র বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। আদালতের নথি প্রায় নয় মাস গায়েব থাকা এবং নথি সংরক্ষণে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তৎকালীন জিআরও পুলিশ সদস্য আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৩৪ ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযুক্ত তিনজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ১৯ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদনটি শিশু আদালত-২, গাইবান্ধায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে আইনজীবী রিপনের বিরুদ্ধে ওঠা জালিয়াতির বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পর হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন জেলা বারের আইনজীবী সরওয়ার হোসেন বাবুল। তার দাবি, তিনি কয়েকজন আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। পরে আদালতের নির্দেশে রিপনের বিরুদ্ধে গাইবান্ধা সদর থানায় দুটি মামলা করা হয়।
বাবুলের অভিযোগ, ওই মামলাগুলোর তদন্তভার গাইবান্ধা সদর থানার উপপরিদর্শক সুদীপ্ত শাহীনের ওপর থাকলেও রিপনকে গ্রেপ্তার না করে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে একটি মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে হয়রানি করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর তাকে ২২ দিন কারাগারে থাকতে হয় বলে জানান তিনি। পরে জামিনে মুক্তি পান।
তদন্ত প্রতিবেদনে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং বিচারিক নিষ্পত্তিই শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করবে।

