স্বামীকে গুলিতে হারানোর পর তাঁর হত্যার বিচার চাইতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে নিজের মেয়েকেও হারানোর দাবি করেছেন রুমা বেগম। তাঁর অভিযোগ, ২০২৫ সালের মার্চে স্বামী হত্যার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে ঢাকায় আসার সুযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁর মেয়ে লামিয়াকে ধর্ষণ করেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে লামিয়া আত্মহত্যা করেন বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন রুমা। বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি এসব অভিযোগ করেন।
জবানবন্দির একপর্যায়ে স্বামী ও মেয়েকে হারানোর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা। তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে তাঁর স্বামী মো. জসিম উদ্দিনের হত্যার বিচার দাবি করেন।
আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন জসিম
৪১ বছর বয়সী রুমা পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর স্বামী জসিম উদ্দিন ‘পদক্ষেপ’ নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চালক হিসেবে কাজ করতেন।
রুমার জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে জসিম আহত হন। ধাওয়া খেয়ে ধানমন্ডির কোনো একটি এলাকায় গাড়ি রেখে তিনি বাসায় ফেরেন।
পরদিন ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন জসিম। এরপর আর ফিরে না আসায় তাঁর মোবাইলে ফোন করেন রুমা। ফোনটি বন্ধ পান তিনি।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রতিবেশী কোহিনুর বেগমের কাছ থেকে জানতে পারেন, জসিম আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছেন। এরপর চাচা শ্বশুর সালাম গাজীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান তিনি।
রুমার ভাষ্য, হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পান। তখনও জসিমের জ্ঞান ছিল। তিনি জানান, গুলিতে জসিমের দুটি আঙুল উড়ে যায় এবং বুকেও গুলি লাগে। গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায় বলে রুমার কাছে জানান জসিম।
রুমার দাবি, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে জসিম আহত হন।
২৯ জুলাই মৃত্যু, লাশ পেতে ভোগান্তি
সাক্ষ্য অনুযায়ী, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জসিমের অস্ত্রোপচার হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আরেক দফা অস্ত্রোপচারের পর তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।
রুমার অনুরোধে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ২৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে জসিম মারা যান।
এরপর স্বামীর লাশ নিতে গিয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে জটিলতার মুখে পড়েন বলে ট্রাইব্যুনালে জানান রুমা। তাঁর ভাষ্য, এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরেও তাৎক্ষণিকভাবে ক্লিয়ারেন্স পাননি তিনি।
পরে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করার পর ৩১ জুলাই জসিমের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন রুমা এবং পরদিন সকালে জসিমকে দাফন করা হয় বলে জানান তিনি।
‘মেয়েকে রেখে ঢাকায় এসেছিলাম’
রুমার দাবি, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর হত্যার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ তিনি ঢাকায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাই বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা ও ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম।
তাঁর বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন বলে জানান রুমা।
রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে লামিয়াকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা ধর্ষণ করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই তাঁর মেয়েকে লক্ষ্য করে এই যৌন সহিংসতা চালানো হয়।
রুমা বলেন, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর লামিয়া মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং পরে আত্মহত্যা করেন।
তবে মেয়ের ধর্ষণ ও আত্মহত্যার বিষয়ে রুমার এই বক্তব্য মামলার সাক্ষ্য হিসেবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং এর সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণের বিষয়।
আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
জবানবন্দিতে রুমা জসিম হত্যার ঘটনায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও পুলিশের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও তোলেন। তিনি দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজনকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখেছেন। তাঁদের মধ্যে আসিফ আহমেদ, তারিকুজ্জামান রাজিব, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আহাদ হোসেন সোহাগ ও ফজলে রাব্বির নাম উল্লেখ করেন তিনি।
রুমা বলেন, তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকতেন এবং অভিযুক্ত কয়েকজনকে আগে থেকেই চিনতেন।
জবানবন্দিতে তিনি আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের সমর্থনে তদন্তে সংগৃহীত আলামত, ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিচারিকভাবে মূল্যায়ন করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
মামলাটিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।
স্বামীকে হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি মেয়ের ওপর যৌন সহিংসতা ও পরবর্তী মৃত্যুর অভিযোগেরও বিচার দাবি করেন রুমা। তাঁর সাক্ষ্য এখন মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কতটা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়, সেটিই পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

