মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের করা আপিলের শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষে আদালত নিয়মিত কার্যক্রমে ফেরার পর চার সপ্তাহের জন্য শুনানি মুলতবি করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে অবকাশ শুরু হবে। সাপ্তাহিক ছুটিসহ অবকাশ শেষে ২৫ অক্টোবর নিয়মিত আদালত বসবে। ফলে আবুল কালাম আযাদের আপিলের শুনানি নভেম্বর মাসে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
আবুল কালাম আযাদের পক্ষে থাকা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী জানান, অবকাশের পর চার সপ্তাহের জন্য শুনানি মুলতবি করা হয়েছে। এখন মূল আপিলের পাশাপাশি আপিলের বিলম্ব মার্জনা ও সাজা স্থগিতের আবেদনের ওপরও একসঙ্গে শুনানি হবে।
আদালতে আবুল কালাম আযাদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী ও ইমরান এ সিদ্দিকী এবং আইনজীবী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মীর ওসমান বিন নাসিম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
১৩ বছর পর আপিল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই রায়ের প্রায় ১৩ বছর পর চলতি বছরের ৬ জুলাই বিলম্ব মার্জনার আবেদনসহ আপিল করেন তিনি।
আবুল কালাম আযাদের আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, আপিল করতে ৪ হাজার ৯১৫ দিনের বিলম্ব হয়েছে। সেই বিলম্ব মার্জনার পাশাপাশি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিত রাখার আবেদনও করা হয়।
আপিলটি প্রথম শুনানির জন্য গত ১৭ আগস্ট আপিল বিভাগে ওঠে। সেদিন আবুল কালাম আযাদের আপিল খারিজ চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার আপিলটি আদালতের কার্যতালিকায় ছিল।
সাজা স্থগিতের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন
আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা এরই মধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ আগামী ২২ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা।
তাহলে শুনানি মুলতবি থাকাকালে তাঁর বিষয়ে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী বলেন, ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন আবুল কালাম আযাদ। সেদিন শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি সরবরাহের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি আপিল বিভাগ থেকে যথাযথ আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি যে অবস্থায় আছেন, সে অবস্থায় থাকবেন বলে আদেশ দেওয়া হয়।
যে মামলায় মৃত্যুদণ্ড
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়।
রায় ঘোষণার আগে থেকেই আবুল কালাম আযাদ পলাতক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আগে তাঁর দেশে ফেরার খবরও প্রকাশ্যে আসে।
দীর্ঘ সময় পর আত্মসমর্পণ করে করা এই আপিলের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—আদালত ৪ হাজার ৯১৫ দিনের বিলম্ব মার্জনা করে আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করবেন কি না। সেই প্রশ্নের পাশাপাশি মূল মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ও আপিল বিভাগে পর্যালোচনার সুযোগ পাবে, যদি আপিলটি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

